পর্যটন মানচিত্রে উপেক্ষিত বৃহত্তর জয়নগর
ভূমিকা
জয়নগর-মজিলপুরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
জয়নগরের
ইতিহাস এই ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব না হলেও একটু তুলে ধরা দরকার। ১৮৫৫
সালের মহাবিদ্রোহের পর থেকে ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী মানসিকতা ও স্বদেশপ্রেমের ডাকে
যখন সবে একটু একটু করে স্বায়ত্বশাসনের দানা বাঁধতে শুরু করেছে, সেই তখন থেকে
সুন্দরবনের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত সমৃদ্ধশালী নগরী জয়নগর-মজিলপুর ও সেখানকার কৃতি
সন্তানরা এঁকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতিতে ধ্রুবতারার ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে
অবস্থান করে। স্বায়ত্বশাসনের অধিকার ছিনিয়ে আনার প্রস্তুতিপর্বে ১৮৬৫ সালে
প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর পিতা পণ্ডিত হরানন্দ বিদ্যাসাগরের
সভাপতিত্বে প্রথম তৈরি হল জয়নগর টাউন কমিটি। সেই কমিটি গঠনের মাত্র চার বছরের
মধ্যে অর্থাৎ ১৮৬৯ সালে ১লা এপ্রিল তা জয়নগর পৌরসভা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে যা
দক্ষিণ ২৪ পরগণাসহ সারা বাংলার প্রাচীন পুরসভাগুলির মধ্যে অন্যতম। একসময়এই জয়নগর ও
মজিলপুরের বুক চিরে প্রবল ধারায় প্রবাহিত হয়ে যেত আদিগঙ্গার ধারা যা আজ মৃতপ্রায়
এবং মানুষ তাঁকে অধিগ্রহণ করে নিয়ে মিত্রগঙ্গা, ঘোষগঙ্গা, বোসগঙ্গা নাম দিয়ে
পুকুরের ন্যায় প্রতিপালন করছেন। কিন্তু, কোন সভ্যতার বিকাশে নদীর ভূমিকা কতখানি তা
ইতিহাসে হরপ্পা, মহেঞ্জাদারো, সিন্ধু-গাঙ্গেয় সভ্যতা দেখলে বোঝা যায়। অপরদিকে আমরা
পুরাণে খুঁজলে দেখি সত্যযুগে নারায়ণ ক্ষীরোদসাগরের তীরে, ত্রেতায় রামচন্দ্র সরযু
নদীর তীরে, দ্বাপরে কৃষ্ণ যমুনার কুলে, কলিতে জগন্নাথ সাগরপারে, মহাপ্রভু
শ্রীচৈতন্য ভাগীরথী গঙ্গার ঘাটে অবস্থান করে তাঁদের লীলা সম্পন্ন করেন। তাছাড়া
কাশী, বারানসি, হরিদ্বার, পুরীধামের অবস্থান এই নদীমাতৃক সভ্যতার পক্ষে সওয়াল
করেছে। ঠিক তেমনি আজ থেকে ২৪৩ বছর আগে অর্থাৎ ১৭৭৫ সালের আগে পর্যন্ত এই স্থানে
গঙ্গার মাহাত্ম্য বিদ্যমান ছিল এবং অবিভক্ত বাংলার চব্বিশ পরগণা জেলার সমৃদ্ধস্থান
ছিল এই জয়নগর। মজিলপুর তার অনেক পরে সুন্দরবনের জঙ্গল হাসিল করে গঙ্গার মজে যাওয়া
বক্ষে বাসস্থান গড়ে তোলেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য যশোরের চন্দ্রকেতু দত্ত ও তাঁদের
কুলগুরু শ্রীকৃষ্ণ উদ্গাতা ছিলেন।
মজার
বিষয় ১৭৭৫ সালে যখন মুর্শিদকুলি খাঁ বেতরের কাছে খাল কেটে গঙ্গার মূল ধারা ঘুরিয়ে
সরস্বতী নদীর মরা খাত দিয়ে বজবজ, রায়চক, ফলতা, ডায়মণ্ডহারবারের পাশ দিয়ে সাগরের
মুড়িগঙ্গায় নিয়ে গিয়ে মেশায় তখন থেকে আদিগঙ্গার মৃত্যু ঘণ্টা বাজতে শুরু করে।
ফলশ্রুতি হিসাবে আজ থেকে মাত্র ৩৬ বছর পূর্বে স্থাপন করেও ডায়মণ্ডহারবার পৌরসভার
উন্নতি আমাদের কাছে ঈর্ষার কারণ। এর সাথে সাথে পুজালি, বজবজ, মহেশতলা পুরসভার
সমৃদ্ধি শুরু হয়। আদিগঙ্গার কৃপা থেকে বঞ্চিত হয়েও শুধুমাত্র উন্নত যোগাযোগ
ব্যবস্থার কারণে ও বৃহত্তর কলকাতার অংশবিশেষ হয়ে বারুইপুর আর সোনারপুর-রাজপুর
পুরসভার উন্নয়ন অন্য মাত্রা নিয়ে নিল। এই জয়নগরের কৃতি সন্তানরা ব্রিটিশ শাসনকাল
থেকে রাজধানী কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগঠনে
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। এমনকি এই জয়নগরে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায় ও নেতাজী সুভাষচন্দ্রের আগমন যেমন ঘটে, তেমনি প্রেমের অবতার মহাপ্রভু
শ্রীচৈতন্য আদিগঙ্গার তীর ধরে চক্রতীর্থ ভ্রমণ করে শ্রীক্ষেত্র পুরীধামে গমন করেন।
এই স্থানের পণ্ডিত মানুষদের তর্কশাস্ত্রে পাণ্ডিত্যের কারণে একে দ্বিতীয় নবদ্বীপ
বলা হত।বর্তমানে প্রমান হিসাবে এই জয়নগরের বুকে এত বিদ্যালয় বা বাড়িতে বাড়িতে
সঙ্গীত ও নৃত্যসহ বিভিন্ন সংস্কৃতির চর্চাকেন্দ্রের অবস্থান যথেষ্ট। ঘটনাচক্রে, এই
জলপথে আগত বিদেশী মগ, পর্তুগীজ, ফরাসী জলদস্যুরা প্রায়শই জয়নগরে লুট সন্ত্রাস
চালাত এবং নিকটবর্তী জঙ্গলে ঢেকে থাকা মগরাহাট এলাকায় লুকিয়ে থাকত। কথিত আছে এই মগ
দস্যুদের নামানুসারে মগরাহাটের নামকরণ হয়েছে। সময়ের ফেরে সেই মগরাহাট আজ অনেক
সমৃদ্ধি লাভ করলেও শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে পিছিয়ে আছে। আর দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার
ইতিহাস যারা লিখেছেন তাঁদের বর্ণনায় এই আদিগঙ্গার তীরবর্তী জনপদের আলোচনা জায়গা
পেয়েছে বেশী করে, যা মধ্যে জয়নগর অগ্রণী স্থানে। ইতিহাসের পাশাপাশি আমাদের এই
স্থানের ভৌগোলিক পরিবেশ জেনে নেওয়া দরকার।
ভৌগলিক গুরুত্ব
ভারতবর্ষের
অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা থেকে দক্ষিনে প্রায় ৫০ কিমি দূরে অবস্থিত এই
উপশহর যা দক্ষিণ ২৪ পরগণা তথা এককালের সারা বাংলার রত্নগর্ভা জয়নগর ও মজিলপুর আজও
দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়। বৃহত্তর জয়নগর বলতে জয়নগরের দুটি ব্লক ও আশেপাশের এলাকাকে
চিহ্নিত করা হয়েছে। কলিকাতার উপকণ্ঠে এবং সুন্দরবনের একেবারে প্রবেশদ্বারে এই
পুরসভার অবস্থানের কারণে এখানে শিক্ষা, সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছিল যার প্রমান আজও
বিদ্যমান। এই জয়নগরের সীমানা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে
জয়নগরের সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে পুরসভার থেকে থানার গুরুত্ব বেশী দেওয়া হয়েছে।
এই নগরের উত্তরদিকে শ্রীপুর ও দুর্গাপুর অঞ্চল, দক্ষিণদিকে ফুটিগোদা এবং পূর্বদিকে
ফুটিগোদা ও সাহাজাদাপুর অঞ্চল,পশ্চিমদিকে অবস্থান করছে উত্তর দুর্গাপুর ও
বিষ্ণুপুর অঞ্চল। জয়নগরের ভূগোলে জয়নগর ও মজিলপুর মৌজার পাশাপাশি গহেরপুর,
বংশীধরপুরের কিছু অংশ, রামনারায়ণপুরের কিছু অংশ, তাজপুর-ফতেপুরের কিছু অংশ,
বনমালীপুরের কিছু অংশ ও দোসরা ভগবানপুরের কিছু অংশের মৌজা এই এলাকার অন্তর্ভুক্ত।
বর্তমানে অনেক নতুন থানা তৈরির কারণে এলাকা বিভাজনে রদবদল যেমন ঘটেছে তেমনি
বারুইপুর মহকুমা স্থাপনের মধ্যে দিয়ে জয়নগর-মজিলপুরের আলিপুর মহকুমা থেকে
বারুইপুরের অন্তর্গত করা হয়। বারিদহাটা পরগণার মধ্যে অবস্থিত এই স্থানের ভৌগোলিক
গুরুত্ব তো ইতিহাসের আলোচনায় প্রমান পায়। কারণ গঙ্গার প্রবাহ অর্থ নিম্নগতিতে
পলিসমৃদ্ধ এলাকা তা মানবসভ্যতার বিকাশে বড় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। ব্যবসা বানিজ্যের
একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল এই আদিগঙ্গা। সেই সময় জয়নগর কিন্তু রেলপথে কলকাতার
সাথে যোগাযোগ তৈরি হয় নি। খালপথে নৌকা করে মগরাহাট স্টেশনে এসে ট্রেন ধরে কলকাতায়
যেতে হত। আদিগঙ্গার পূর্বদিকে কেবলমাত্র একটি পায়ে হাঁটা পথ ছিল যা ‘দারির
জাঙ্গাল’ নামে পরিচিত। এই রাস্তা ধরে সুন্দরবন থেকে কালীঘাট পর্যন্ত যাওয়া যেত।
পরবর্তীকালে জয়নগরের সাথে কলকাতার সড়কপথে বাস চলাচল শুরু হলেও কালের নিয়মে তা বন্ধ
হয়। বর্তমানে আবার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯২৮ সালে শিয়ালদহ থেকে লক্ষ্মীকান্তপুর
রেলে যুক্ত হলে এখানকার চালচিত্র বদলাতে থাকে।
তবে
এই জয়নগরে বেশীরভাগ মানুষ এসেছে বাইরে থেকে যেমন গুনানন্দ মতিলাল ও চন্দ্রকেতু
দত্ত যশোর থেকে আসেন তেমনি রামগোপাল মিত্র আসেন বেহালার বরিষা থেকে। আর আদিগঙ্গার
মাহাত্ম্য ও তার দুই তীরে মন্দির ও শ্মশানের অবস্থান থাকায় নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মনদের
আগমন ঘটে কারণ বেতর থেকে কাকদ্বীপের মুড়িগঙ্গা পর্যন্ত প্রবাহিত গঙ্গার মাহাত্ম্য
নেই, ওটা কাটাগঙ্গা। ঐ জলে কোন মাঙ্গলিক কাজ আজও হয় না, কোন পুন্যলগ্নে কেউ স্নানও
করে না। কিন্তু এই মজে যাওয়া জয়নগর বারাসাত বারুইপুরের গঙ্গায় মানুষ আজও ডুবে
পুণ্য অর্জন করেন। যাইহোক, সেইসব বহিরাগত মানুষেরা নিজেদের প্রয়োজনে শিক্ষা
সংস্কৃতির বিকাশে সহায়তা করেন এবং পরবর্তীকালে জয়নগরের সমৃদ্ধি অন্যান্য মানুষকে
টেনে আনে তখন এখানকার অনেক বনেদি পরিবারের ব্রাহ্মন পরিবার কলকাতা শহরের দিকে চলে
যেতে থাকেন। এবার আমরা দেখে নেব, এমন একটি প্রাচীন জনপদ যা রাজা প্রতাপাদিত্যের
সময় থেকে বারেবারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়লেও তার মহিমা কোন অংশে কমেনি,
শুধুমাত্র তার প্রাচীন স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের অবস্থানে। সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন
জনপদের এক এবং অনন্য স্মারক ও মানুষের আবেগজড়িত মন্দির ও দেবদেবীকে সাথী করে
জয়নগরের নাম পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে কিভাবে প্রতিস্থাপন করা যায় সেটাই নিম্নে
বিভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা করা হল-
দেবী জয়চন্ডী মন্দির
ইতিহাস প্রসিদ্ধ উপন্যাস নকুলেশ্বর বিদ্যাভূষণ রচিত ‘কুমুদানন্দ’ গ্রন্থে প্রথম জয়নগরের নাম শোনা যায়। এই জয়নগরের রাজা নীলকণ্ঠ মতিলাল করদ রাজা হিসাবে রাজা সুবুদ্ধিরায়ের রায়নগর রাজ্য তথা রায়মঙ্গল ঠেকে সূর্যপুর ও পশ্চিমে সরস্বতী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এলাকার কিছু অংশ শাসন করতেন। এক হাজার এক সালে যখন সমগ্র জয়নগর ভেসে যায়, রায়নগর রাজ্যের অধিকাংশ জনশুন্য হয়ে পড়ে। নীলকণ্ঠ মতিলাল মগধের যুদ্ধে প্রাণ হারালে তার ভাই সপরিবারে যশোরে চলে যান, কিন্তু কয়েক পুরুষ পরেই ঐ বংশের সুপুত্র গুনানন্দ মতিলাল পৈতৃক সম্পত্তি ও কুলদেবী জয়চন্ডী দেবীকে উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের সাথে সাথে সেই মূর্তির পাশে দারুকাষ্ঠ দ্বারা নির্মিত নতুন মূর্তি রচনা করা হয়। সেই থেকে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১০১৮ বছর পূর্ব থেকে এই দেবী পূজিত হয়ে আসছেন। এই দেবীর নামে জয়নগরের নামকরণ বলে মনে করা হয়। এই দেবীর প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসে একপক্ষকালব্যাপী রূপপরিবর্তনের মেলা ও পূজা হয়ে আসছে। এই জয়চন্ডী দেবীই যে জয়নগরের নামের সুত্রপাত সেটার ইতিহাস ব্যক্ত করতে হবে। অনেকে জয়নগরে বসবাস করছেন কিন্তু এই ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। কিন্তু, এই প্রবন্ধে স্থান সীমিত হওয়ায় বেশী কথা লেখা গেল না।
পরিব্রাজক গৌতম এর বর্ণনায়, জয়নগর-মজিলপুরে ধন্বন্তরী কালীর মতোই অত্যন্ত জাগ্রত হলেন
চণ্ডীতলার জয়চণ্ডী। দেবীর নাম অনুসারেই জায়গাটির নামকরণ। গাছগাছালিতে ঘেরা বর্ধিষ্ণু
গ্রাম জয়নগর। এই গ্রামের মধ্যেই অবস্থিত দক্ষিণমুখী শ্রীশ্রী জয়চন্ডী মাতার মন্দির।
কথিত আছে প্রায় তিনশো বছর আগে জয়চণ্ডীদেবীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন কলকাতার মতিলাল পরিবারের
গুণানন্দ মতিলাল। এই মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী চণ্ডীর আবির্ভাব নিয়ে বেশ কিছু কিংবদন্তী
আছে। তার মধ্যে একটি হল গুণানন্দ ও জৈনক টুনুপণ্ডিত একদিন নৌকাযোগে আদিগঙ্গা দিয়ে যাওয়ার
সময় নদীর তীরে এক সুন্দরী রমণীকে একাকী বিচরণ করতে দেখেন। তাঁরা নৌকা থেকে তীরে নামার
পর ওই রমণীকে আর দেখতে পেলেন না। সেইরাতেই গুণানন্দ স্বপ্নাদেশে জানতে পারেন যে, ওই
রমণী হলেন শ্রীশ্রীজয়চণ্ডী। স্বপ্নাদেশে দেবী জানালেন যে, তাঁকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা
করে সেবাপুজোর ব্যবস্থা করতে। আরো একটি জনশ্রুতি হল, কয়েক শো বছর আগে এই গ্রামে বাস
করতেন এক গরীব নিষ্ঠাচারী ব্রাহ্মণ। তিনি একদিন রাত্রে স্বপ্নে দেখেন পাশের পুকুরের
জলে এক দিব্য জ্যোতির্ময়ী দেবী ভেসে বেড়াচ্ছেন। তৎক্ষণাৎ সেই ব্রাহ্মণের ঘুম ভেঙে
যায়। তিনি দৌড়ে স্বপ্নে দেখা সেই পুকুরের দিকে গেলেন। ইতিমধ্যে ভোরের আলো ফুটেছে।
তিনি পুকুরের মধ্যে একটি শিলাখণ্ড দেখতে পেলেন। পবিত্র শিলাখণ্ডটিকে দেখেই তিনি বুঝতে
পারলেন গতরাতে স্বপ্ন দেখা এটিই সেই দিব্য জ্যোতির্ময়ী দেবী। পুণ্যবান ব্রাহ্মণ পুকুর
থেকে উদ্ধার করেন সেই দিব্য শিলাখন্ডটি।
দেবী চণ্ডী পুনরায় ব্রাহ্মণকে স্বপ্নাদেশ দিয়ে নিজের
স্বরূপ প্রকাশ করে বলেন, তোর বাড়ির সামনে যে বকুল গাছ আছে তার তলায় আমার প্রতিভূ
ওই শিলাখণ্ডকে প্রতিষ্ঠা করে নিত্য সেবা পুজো করবি। দেবী আরো নির্দেশ দিলেন, ওই বকুল
বৃক্ষ দিয়েই যেন তাঁর বিগ্রহ নির্মাণ করা হয়। এই বলে দেবী স্বপ্ন থেকে অদৃশ্য হলেন।
কালান্তরে ওই স্থানে মন্দির নির্মাণ করে শ্রীশ্রী দেবী জয়চণ্ডীর দারু বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা
করা হয়। দেবীর নাম অনুসারে গ্রামের নাম হয় জয়নগর। দেবীর কৃপায় বর্ধিষ্ণু গ্রাম হিসেবে
খ্যাতিও অর্জন করে জয়নগর।
দেবীর বর্তমান দক্ষিণমুখী মন্দিরটি ১৯৫০ সালে কলকাতার মহেন্দ্র শ্রীমানি নির্মাণ করেন।আর নাটমন্দিরটি নির্মাণ করেন নিত্যহরি মতিলাল। গর্ভমন্দিরে একটি সিমেন্টের বেদিতে কাঠের মঞ্চের উপর বকুল গাছের নির্মিত আড়াই ফুট উঁচু শাড়ি পরিহিত দেবীর দারুবিগ্রহ আজও বিরাজমান।গৌরবর্ণের ত্রিনয়নী দেবীর হাতদুটি অলঙ্কার শোভিত। অভয় ও বরাভয় মুদ্রায় রতা।মাথায় মুকুট। স্বপ্নাদেশে প্রাপ্ত ওই দিব্য শিলাখণ্ডটিও ওই দারুবিগ্রহের সহিত নিত্যসেবিত হয়। আপামর গ্রামবাসীর বিশ্বাস দেবী জয়চণ্ডী অত্যন্ত জাগ্রতা। স্থানীয় ভক্তপ্রাণা অধিবাসীরা বলেন দেবী নাকি আজও প্রতি রাত্রে নিশিভ্রমণে বের হন। কোনো কোনো সৌভাগ্যবান নাকি তাঁর দর্শন পেয়েছেন।
সম্বিতেশ্বর মন্দির
জয়নগর মজিলপুরের সুপ্রাচীন শিবতীর্থ শ্রী শ্রী সম্বিতেশ্বর মন্দির। আগেই বলেছি যে আদিগঙ্গার তীরে তীরে মন্দির ও শ্মশানের অবস্থান ছিল, আজও আছে। এমনই একটি মন্দির শ্রী শ্রী সম্বিতেশ্বর মন্দির। আদিগঙ্গার পূর্বতীরে অর্থাৎ মজিলপুরের জ্ঞানপীঠ বিদ্যালয়ের ঠিক পাশেই দত্তপাড়া যাওয়ার রাস্তার পাশেই এই মন্দির অবস্থান করছে। এই মন্দির নির্মাণের পিছনে যে ইতিহাস তা কয়েকটি শিশু খেলতে খেলতে একটি গোলাকার পাথর খুঁজে পান এবং দত্ত পরিবারের নায়েব পরিবারের দেওয়ান ঢোসা চন্দনেশ্বর নিবাসী কালাচাঁদ নাইয়া স্বপ্নাদেশ পান এই মন্দির স্থাপন করার। তিনিই ১২৯৮ বঙ্গাব্দে এই মন্দির নির্মাণে এগিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে চন্দ্রনাথ নাইয়া এই মন্দির সংস্কার করান। মন্দিরটি একসময় মজে যাওয়া গঙ্গার বক্ষে অবস্থান করায় মন্দিরের গঠনগত কয়েকটি অত্যাশ্চর্য ঘটনা বর্তমান। এই স্থানটি একসময় সুন্দরবনের অংশবিশেষও ছিল। মন্দিরের গর্ভগুহা থেকে একটি সুড়ঙ্গ থাকার কথা শোনা যায়, যেখান থেকে দুটি শৃগাল এসে ভোগের নৈবেদ্য গ্রহণ করে যেত। এছাড়াও এই মন্দিরের নিচে বিষধর সাপ ও ব্যাঙের একত্রে অবস্থানের কথা শোনা যায়। যারা মন্দিরের আরতির সময় শঙ্খ ঘণ্টার আওয়াজ পেলেই তারা চলে আসত প্রসাদ পেতে। বর্তমানে জনবসতির ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় এই ধরনের অলৌকিক ঘটনার দর্শন আর মেলে না। পর্যটক বা ভক্তদের সমাগম হতে পারে যদি এই অলৌকিক মন্দির সম্পর্কে যথাযথ প্রচার থাকে।
শ্যামসুন্দর মন্দির
জয়নগর পৌরসভার একেবারে শেষপ্রান্তে দুর্গাপুরের শ্যামসুন্দর মন্দির অবস্থিত। এখানকার বিগ্রহ দারুমূর্তি ৩ ফুটের মত উচ্চতা। শোনা যায় ১৮২১ সালে নন্দকুমার বসু বৃন্দাবন থেকে ফিরে মাতৃ আদেশে প্রায় তিনলক্ষ টাকা ব্যয়ে এই মন্দির নির্মাণ করান এবং তাঁর জমিদারির এক বৃহৎ অংশ শ্যামসুন্দর জিউর নামে দেবোত্তর করে যান। এই মন্দিরের বিশেষ বৈশিষ্ট মন্দিরটি ফ্রেসকো দ্বারা সজ্জিত যা সমগ্র বাংলায় খুব কম। সুদুর জয়পুর থেকে আনা প্রস্তরে নির্মিত এই মন্দিরে কারুকার্যখচিত কাঠের সিংহাসনে বসানো আছে কষ্টি পাথরে নির্মিত শ্রীকৃষ্ণ ও অষ্টধাতু নির্মিত রাধারানীর বিগ্রহ। এই যুগলমূর্তিই শ্যামসুন্দর জিউ নামে পরিচিত। এখানেও একটি দোলমঞ্চ আছে গোষ্ঠমেলা, রাসযাত্রা ও দোলযাত্রার সময় বিশাল মেলার আয়োজন করা হয়।
রাধাবল্লভ জিউর মন্দির
অন্যান্য
মন্দিরের মত জয়নগরের প্রায় চার শতাব্দী প্রাচীন এই রাধাবল্লভের মন্দিরের গুরুত্ব
জয়নগর ছাড়িয়ে এখন জেলার প্রত্যন্ত মানুষের কাছে জ্ঞাত। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ
মহারাজ প্রতাপাদিত্যের সাথে মোঘলদের যুদ্ধ হয়,
সেইসময় খাড়ি থেকে কয়েকটি রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ মোঘল সেনাদের হাত থেকে রক্ষা করতে
বর্তমান রাধাবল্লভ জিউকে জয়নগরে এনে একটি ছোট মন্দিরে রাখা হয়।পরবর্তী কালে সেই
মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে দক্ষিণ বারাসতের চৌধুরী বংশের
জমিদার নির্মাণ করে দেন। এই দারুমূর্তির বিগ্রহের উচ্চতা প্রায় ৪ ফুট। আদি গঙ্গার
তীরে এই মন্দিরের নিত্যপূজা ও বাৎসরিক উৎসবে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়ে থাকে। রাধাবল্লভ
জিউর চাঁদনী ও দোলমঞ্চ স্থানীয় মিত্রবংশের পূর্বপুরুষ কৃষ্ণমোহন মিত্র মহাশয়
নির্মাণ করেছিলেন।
প্রতিবছর
দোলযাত্রা ও গোষ্ঠমেলা মহাসমারোহে পালিত হয়। এখানে রাধামাধবকে সুসজ্জিত করে
দোলমঞ্চে বসানো হয়। একসময়, গোষ্ঠমেলার সময়, এখানে একে একে দুর্গাপুর গ্রামের সরখেল
পরিবারের কুলদেবতা শ্যামসুন্দর বিগ্রহ, কেটোয়ারা বনমালীপুরের দারুময় মদনমোহন
বিগ্রহ, জয়নগরের মিত্র পরিবারের কুলদেবতা গোপীনাথ বিগ্রহ, মজিলপুরের হরিদাস দত্তের
প্রস্তরনির্মিত রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ, পোড়া পরিবারের কষ্টিপাথরের শ্যামসুন্দর বিগ্রহ,
বৃন্দাবন দত্ত পরিবারের রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ, জয়নগর উত্তরপাড়ার জিতেন্দ্রনাথ মিত্রের
প্রস্তরনির্মিত প্রস্তরনির্মিত রাধাকৃষ্ণবিগ্রহ, গোপাল সরকারের বাসুদেব বিগ্রহ,
মুলদিয়া ভবানিপুরের পালুইদের রাধাকান্ত বিগ্রহ, ঘোষদের রাধাগোবিন্দ বিগ্রহ,
জয়নগরের ঘোষদের গোপাল বিগ্রহ সহ নানা জায়গা থেকে বিগ্রহ মহাসমারোহে এনে হাজির করা
হতো। যে আনন্দধারায় মিশে যেত হিন্দুমুসলমান আবালবৃদ্ধবনিতা। সময়ের সাথে সাথে তা
অনেকটা কমে গেলেও জৌলুস একটুও কমে নি।
বর্তমানে সেই আদিগঙ্গার অবস্থান আর লক্ষ্য করা না গেলেও মন্দিরের পাশেই তার স্মৃতিস্বরূপ যে গঙ্গা তা রাধাবল্লভ গঙ্গা নামেই পরিচিত। এই গঙ্গা থেকে প্রাপ্ত শিবলিঙ্গকে মূল মন্দিরের পাশেই একটি ছোট মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন শ্যামাদাস ঘটক নামে একজন ভক্ত। ইহা চন্দ্রশেখর শিবলিঙ্গ নামে পরিচিত। মন্দিরের পূর্বদিকে রাধাবল্লভ গঙ্গার তীরেই অবস্থিত কদম্ববৃক্ষে একটি অলৌকিক ঘটনার বিবরণ শোনা যায়। প্রতিবছর দোলপূর্ণিমাতে এই গাছে কেবলমাত্র একটি কদমফুল ফোটে। এহেন প্রাচীন বিগ্রহ ও মন্দিরের টানে মানুষ দৌড়ে আসে। তবে এই ইতিহাস মন্দিরের সামনে একটি ফলক দিয়ে ছোট করে লিখে রাখলে তা পর্যটকদের জানতে সুবিধা হবে বলে মনে করি।
ধন্বন্তরি কালী মন্দির
ষোড়শ-সপ্তদশ শতক। সে সময় আদিগঙ্গা বা
ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী স্থানগুলি ছিল গভীর জঙ্গলে ভরা এবং নিরিবিলি। তন্ত্রসাধকরা
গড়ে তুলছিলেন শক্তিসাধনার ক্ষেত্র। লোকালয় থেকে বেশ খানিকটা দূরে গড়ে উঠছিল এই
শক্তিসাধনার ক্ষেত্রগুলি। এরকমই একটি ক্ষেত্র হল দক্ষিণ ২৪ পরগনার মজিলপুরের
ধন্বন্তরী কালী মন্দির। যাঁর প্রসিদ্ধি এখন সারা বাংলা জুড়ে। রেল লাইনের পূর্বদিকে মজিলপুর গ্রাম।
মনে হয় আদিগঙ্গার মজে যাওয়া গর্ভে স্থানটির সৃষ্টি বলে নাম হয়েছে মজিলপুর। মজিলপুর
পদ্মপুকুর নামেও খ্যাত।
অষ্টাদশ
শতকের প্রথমভাগেও এইস্থান দিয়ে আদিগঙ্গার প্রবাহ বর্তমান ছিল, তখন আদিগঙ্গার পাড়ে
পাড়ে বিভিন্নস্থানে শ্মশান বর্তমান ছিল। আজকের যেখানে ধন্বন্তরি কালী মন্দিরের
অবস্থান, অখানেও একটা শ্মশান বিদ্যামান ছিল। নেতরা থেকে স্বামী ভৈরবানন্দ নামে এক
সাধক নির্জন স্থান দেখে এখানে সাধনায় বসেন ও কিছুদিনের মধ্যে স্বপ্নাদেশে জানতে
পারেন মা ধন্বন্তরি কালী পাশের পদ্মপুকুরের গভীর জলে আমি উপেক্ষিতা হয়ে পড়ে আছি।
আমাকে উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠা কর, পূজা কর, তোর মঙ্গল হবে। স্বামীজি অনুসন্ধান করে
একটি ৩০০ বছরের প্রাচীন কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি পান। বিগ্রহটিকে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরই
নির্মিত একটি ছোট্ট কুটিরে। ইনিই হলেন মা ধন্বন্তরী কালী।সেখানেই তার
কুঁড়েঘরে চলে মায়ের পূজা অর্চনা।
মজিলপুরের ঠাকুরবাড়ির আদিপুরুষ ছিলেন
রাজেন্দ্রলাল চক্রবর্তী। পরিব্রাজকরূপে ভ্রমণকালে ভৈরবানন্দ নামে এক তন্ত্রসাধকের
সাহচর্য লাভ ও শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি। সময়টা ছিল সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ। সেই
সময়েই একদিন রাজেন্দ্রলাল রায়কে স্বপ্নে দেখা দেন দেবী ধন্বন্তরী। পুকুরের কাছে
পড়ে থাকা একটি নিম কাঠ থেকে দেবী বিগ্রহ তৈরির আদেশ দেন মা। পাথর বিগ্রহের স্থলে
নির্মিত হয় নিমকাঠের বিগ্রহ। এই নিমকাঠের বিগ্রহ পূজিত হয়ে আসছে আজও। পরবর্তীকালে
অবশ্য বড় হয়েছে মন্দির প্রাঙ্গণ।সমতল ছাদবিশিষ্ট কালীমন্দিরটি দক্ষিণমুখী।
গর্ভমন্দিরে বেদির উপরে রয়েছে একটি কারুকার্যখচিত কাঠের রথসিংহাসন। তাতে পদ্মের
উপরে শুয়ে আছেন মহাদেব। তাঁরই বক্ষস্থলে দাঁড়িয়ে অপরূপা দীপ্তিময়ী দেবী কালিকা।
মহাদেবের মাথাটি দেবীর সামনের দিকে। শ্রীচরণে মল, দুটি কান কুণ্ডলশোভিত। বসন পরিহিতা
দেবীর এলানো কেশ কোমর ছাড়িয়ে। সালঙ্কারা। ত্রিনয়নী দক্ষিণাকালী। নিকষকালো
কষ্টিপাথরে নির্মিত বিগ্রহ। চোখ ও মনের তৃপ্তি দেয় এই মাতৃবিগ্রহ। দেবীমূর্তির
পাশে দুটি ঘরে রয়েছে দুটি শিবলিঙ্গ।
বর্তমান মন্দিরের সেবায়েত কালিদাস
চক্রবর্তী জানান,
মন্দিরটি সাড়ে
তিনশো থেকে চারশো বছরের প্রাচীন। মজিলপুর নামের উদ্ভব নিয়ে নদীর মজে যাওয়া তত্ত্বে
দ্বিমত নেই তাঁর। রেললাইনের ওপারে মা জয়চন্ডী অধিষ্ঠান করছেন বলে জানান তিনি, এই জয়চন্ডী ধন্বন্তরী মায়ের থেকেও
৪০০-৫০০ বছরের প্রাচীন। তিনি আরও জানান নদী-সংলগ্ন স্থানেই একটি বিরাট শ্মশান ছিল।
সেখানে বসবাস করতেন এক সন্ন্যাসী। তিনিই সেবা করতেন মা ধন্বন্তরীকে। নদী মজে
যাওয়ার আগে নদীপথেই বাণিজ্য করতেন দেশ-বিদেশের বহু জমিদার। একদিন রাত হয়ে যাওয়াতে
কোনও এক জমিদার ডাকাতের ভয়ে এগোতে পারেননি নদীবক্ষে। নোঙর রেখে আশ্রয় নেন
সন্ন্যাসীর কুটিরে। মাকে দেখে ভক্তি জন্মায় তাঁর অন্তরে। তারপর যাতায়াতের পথে মাঝে
মাঝেই আসতেন সন্ন্যাসীর কাছে। একদিন সন্ন্যাসী অনুরোধ করেন ওই জমিদারকে। মা-কে
প্রতিষ্ঠা করার অনুরোধ। অনুরোধ ফেলতে পারেননি জমিদার। মাকে নিয়ে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা
করেন তিনিই। সেই জমিদারই পরবর্তীকালে মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে দারু মূর্তি গড়ান।
মূর্তিটি এককাঠের।
সেবায়েত আরও জানান, ধন্বন্তরী নামটি পরবর্তী কালের।
ধন্বন্তরী হলেন দেবতাদের কবিরাজ। যিনি মরা মানুষকেও বাঁচিয়ে তুলতেন। ধন্বন্তরী মা
নন, তিনি বাবা। মায়ের একটা
স্বপ্নাদিষ্ট ওষুধ আছে, অব্যর্থ
ওষুধ। গ্যাস,
অম্বল জাতীয়
রোগে এটি কাজ করে। সেই ওষুধ খেয়েই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠত রোগীরা। ওষুধটা
ধন্বন্তরীর মত কাজ দিত বলে সবাই মাকে ধন্বন্তরী বলেই ডাকত। সেই থেকেই মায়ের নাম
ধন্বন্তরী। সেই সপ্তদশ শতাব্দী থেকে দেবীর নিত্যসেবা পুজো আজও চলে আসছে অপ্রতিহত
গতিতে। কালীপুজো,
অমাবস্যা, শনি-মঙ্গলবার এই দিনগুলি বাদ দিলেও
প্রতিদিনই হাজারো পুণ্যার্থী ভিড় জমান মন্দির প্রাঙ্গণে। তবে বার্ষিক পুজো হয়
বৈশাখ মাসে। সেই সময়ে মন্দির প্রাঙ্গণে ১৫ দিন ধরে চলে মেলা। সবচেয়ে বিস্ময়কর হল, এই ১৫ দিনই পরিবর্তিত হয় দেবীর বেশ। এখানে
প্রতিবছর বৈশাখ মাসে এক পক্ষকাল ব্যাপী
মায়ের রূপ পরিবর্তন মেলা ও পূজায় হাজার হাজার ভক্ত সমাগম ছাড়াও প্রতি
অমাবস্যা ও পূর্ণিমাতে পূজা হয়। এর পাশে একটি শিবমন্দির ও শনিমন্দির পরে তৈরি করা
হয়েছে। শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের একটি আশ্রম অদুরেই অবস্থান করছে।
দ্বাদশ শিব মন্দির
জয়নগর
মিত্রপাড়ায় আদিগঙ্গার তীরে বেহালা-বড়িশা থেকে প্রখ্যাত রামগোপাল মিত্র জয়নগরে
বসবাসের জন্য আসেন। এই রামগোপাল বাবুর পৌত্র কামদেব মিত্র আদিগঙ্গার তীর ধরে
দ্বাদশ মন্দিরের প্রথম মন্দিরটি ১৭৬১ সালে নির্মাণ করান।সময়ের সাথে সাথে পরবর্তী
পুরুষানুক্রমে এক একটি মন্দির স্থাপন ও পূজার মাধ্যমে বারোটি মন্দির তৈরি হয়।
প্রতি মন্দিরে একটি করে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। একটি নবরত্ন হলেও বাকি
মন্দিরগুলি সব আটচালা প্রকৃতির। ঘটনা হল গঙ্গার পশ্চিম উপকুল, বারানসি সমতুল।
এখানে দ্বাদশ শিবমন্দিরের প্রতিচ্ছবি গঙ্গার জলে যখন পড়ে তা কোন অংশে দক্ষিনেশ্বর,
বারানসির মতো শৈবতীর্থ থেকে কম সুন্দর লাগে না। এখানেও একটি কেন্দ্রীয় ফলক বসিয়ে
এর ইতিহাস স্থাপন করা দরকার। এখানে দোলমঞ্চদর্শনীয় হলেও দোলের মেলা খুব একটা হয় না
তবে রথযাত্রার মেলা বিখ্যাত।
ময়দা কালীবাড়ি
আদিগঙ্গার তীরে ময়দা বহু পুরানো একটি গ্রাম। ১৮৬৯ সালে
পৌরসভা গঠনের সাথে সাথে ময়দা তে অবস্থিত অধুনা জয়নগর থানা ময়দা থেকে তুলে এনে
পৌরসভার মধ্যে স্থাপন করা হয়। এই ময়দা গ্রামের পরিচিতি বাড়ে এখানকার জাগ্রত
কালীমন্দিরের জন্য যা এককথায় ‘ময়দার কালী’ নামে সমধিক পরিচিত।ময়দার এই
কালীমন্দিরের প্রাচীনত্ব নিয়ে নানান মতভেদ বর্তমান থাকলেও জনশ্রুতি আছে যে যখন
আদিগঙ্গা তার পূর্ণশক্তি নিয়ে এখান থেকে প্রবাহিত ছিল তখন থেকে কালীঘাটের
কালীমন্দিরের ন্যায় গঙ্গার তীরে ময়দার কালীবাড়ি স্বমহিমায় অবস্থান করছে। এই
মন্দিরের দরজা নির্মাণ হয়েছে আদিগঙ্গার উপর দিয়ে বয়ে চলা জাহাজের ভগ্নাবশেষ দিয়ে।
কলিকাতার জমিদার সাবর্ণ চৌধুরীর বংশধর গঙ্গাধর চৌধুরী ১১৭৬ বঙ্গাব্দে এই মন্দির
নির্মাণ ও সেবার জন্য প্রচুর সম্পত্তি দান করেন বলে জানা যায়। ময়দার আদি বাসিন্দা
প্রয়াত সুনীল সরকারের মতে ময়দানব থেকে ময়দা’র জন্ম। পুরানে ময়দানব পাতালে থাকতেন।
এই জায়গা সেই পাতালের নিদর্শন বলে অনেক গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এখানকার কালীমূর্তি
কালো কষ্টি পাথরের মন্দির গহ্বরে প্রোথিত এবং খনন কাজ চালিয়ে এর শেষ পাওয়া যায় নি
বলে স্থানীয় লোকের ধারনা। জলের মধ্যে এই পাথর প্রথিত আছে যা ইতিহাসে
প্রত্নতাত্ত্বিক অস্তিত্ব বলে মনে করা হয়। প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রথম তারিখে গঙ্গা
পূজা উপলক্ষে বিরাট আকারে মেলা ও পূজা হয়ে থাকে।
নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রম
আমাদের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা তথা সুন্দরবন
পুলিশ জেলার জয়নগর থানার অন্তর্গত নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রম এখন দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম
আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। তবে স্থানীয় লোকেরা একে মিশন বলতে বেশী পছন্দ করেন। তাঁদের ভাবধারায়
হয়তো নরেন্দ্রপুর, বেলুড় বা সরিষা রামকৃষ্ণ মিশনের সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান বলে এটি জায়গা
করে নিয়েছে। কিন্তু এটি একটি আশ্রম। নিমপীঠ শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম। মজার বিষয় হল এই রামকৃষ্ণ
আশ্রমের সাথে তথাকথিত রামকৃষ্ণ মিশনের কোন যোগসূত্র ছিল না শুরু থেকেই। কিন্তু সেই
রামকৃষ্ণ ভাবধারা ও আদর্শ মেনে চলে এই আশ্রমের কাজকর্ম।
১৯৬০ সালে রামকৃষ্ণ মিশনের অন্যতম সন্ন্যাসী
স্বামী বুদ্ধানন্দজীর হাত ধরে এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে দক্ষিণ ২৪ পরগণা
ও সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সমাজ সেবার কাজ শুরু করে। বেলুড়ের রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ
ভাব প্রচার পরিষদের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার অন্যতম সদস্য কেন্দ্র। আজ থেকে ৬০ বছর আগে
যাত্রা শুরু করে বর্তমানে এই আশ্রমের তিনটি শাখার একটি ঝাড়গ্রামে হলেও অপরটি আমাদের
সুন্দরবনের কৈখালী তে অবস্থান করছে। এই আশ্রমে যেতে হলে আপনাকে জয়নগর মজিলপুর স্টেশনে
নেমে বাস বা অটো বা টোটোতে করে ১৫ মিনিটের পথ যাত্রা করতে হবে।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত ডাঃ বিধান চন্দ্র
রায়ের বরাবর জয়নগরের প্রতি একটা দুর্বলতা কাজ করত, সেটা আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে জেনেছি।
তখন থেকে তিনি চেষ্টা করেছিলেন জয়নগরকে দক্ষিণ ২৪ পরগণার জেলাসদর করার। কিন্তু তাঁর
অকালপ্রয়াণে সেই চেষ্টা বিফল হয় এবং আজও জেলাসদর বাস্তবে আলিপুরে রয়ে যায়। যাইহোক,
ডাঃ রায়ের সহযোগিতায় এই আশ্রমের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল।
জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে তখন দারিদ্র, অশিক্ষা,
বেকারত্ব আর কুসংস্কারের বেড়াজালে পুরো ধুঁকছিল যখন, তখন এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন
স্বামীজির মার্গ অনুসরণ করে চলা বুদ্ধানন্দজী মহারাজ। শুরু হল শিক্ষা প্রসারে বিদ্যালয়
স্থাপনের কাজ, আর্তের সেবায় চিকিৎসালয়, কৃষিকাজে সহায়তা প্রদান করতে কৃষি গবেষণা কেন্দ্র।
সবই এই আশ্রমের তত্ত্বাবধানে চলতে লাগলো। এই কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্র চালু হয় ১৯৭৯ সালে
দিল্লীর INDIAN COUNCIL OF AGRICULTURAL RESEARCH (ICAR) এর সহায়তায়।
জয়নগর-মজিলপুরের
অদূরেই অবস্থান করছে ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারা ও আদর্শ নিয়ে
তৈরি নিমপীঠ রামকৃষ্ণ মিশন। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই মিশন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও
কারিগরি দক্ষতায় সারা ভারতবর্ষে এক উল্লেখযোগ্য স্থান অর্জন করে। বিজ্ঞানের
গবেষণায় ও কৃষিতে সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বেশ কয়েকটি পুরস্কার
মেলে। যে সকল পর্যটক এই জয়নগর মজিলপুর ভ্রমণ করতে আসবেন তাঁদের কাছে এই রামকৃষ্ণ
মিশন একটি দ্রষ্টব্য স্থান হিসাবে তুলে ধরা যাবে। তাতে জয়নগরের পর্যটন মানচিত্র
আরও মজবুত হবে। কাছেই সারদা মিশন মা সারদা দেবীর দর্শন ও শিক্ষা নিয়ে স্থাপন করা
হয়েছে, যা নারি শিক্ষার প্রগতিতে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর সাথে কুলতলি
থানার কৈখালীর মিশন ও সুন্দরবনের নদী ও জঙ্গলের হাতছানি যে রয়েছে তা সামগ্রিকভাবে
এলাকার পর্যটন উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
ঐতিহাসিক কালিদাস দত্তের বাড়ি
বাংলার প্রখ্যাত ঐতিহাসিকদের মধ্যে ঐতিহাসিক কালিদাস
দত্তের নাম উল্লেখযোগ্য। এই কালিদাস দত্ত প্রকৃতপক্ষে মজিলপুরের সুসন্তান আর
চন্দ্রকেতু দত্তের বংশধর নামে সুপরিচিত। আগেই বলেছি যে এই জয়নগর রত্নগর্ভা। একথা
হলফ করে বলা যায় যে যদি কালিদাস দত্ত না আসতেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগণাসহ সুন্দরবনের
ইতিহাস হয়তো বা অপ্রকাশিত থেকে যেত কিংবা বিকৃত হয়ে প্রকাশ পেত। এমনিতেই দক্ষিণ ২৪
পরগণার অনেকটাই অতীত কালের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে চর্চার অভাবে।
সুন্দরবনের প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধানে সুন্দরবনের
সন্তান দক্ষিণ ২৪ পরগণার জয়নগর মজিলপুরের বিখ্যাত দত্ত পরিবারের জমিদার বংশে ঐতিহাসিক কালিদাস দত্ত (১৮৯৫-১৯৬৮) আমাদের জেলা ছাড়িয়েও বাংলার পুরাতত্ত্ব
ও ইতিহাসবিদদের কাছে এই উল্লেখযোগ্য নাম। ১৯২৫-২৬ সাল থেকে যুবক কালিদাস দত্ত সুন্দরবনের
বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রত্যন্ত দ্বীপে পায়ে হেঁটে পরিভ্রমণ করে বাংলার ইতিহাস ও পুরাতত্ত্ব
আবিষ্কার, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মধ্যে দিয়ে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
কালিদাস দত্ত আজীবন যা সংগ্রহ করে গেছেন সেগুলো বেশ কিছু জেলার বিভিন্ন সংগ্রহশালায়
রয়েছে কিন্তু অধিকাংশ মূল্যবান প্রত্ননিদর্শন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেছেন
যা আশুতোষ মিউজিয়ামে আজও আছে। এছাড়া সংস্কৃত কলেজ, নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রমে, সুন্দরবন
সংগ্রহশালায় দিয়েছেন অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। তিনি মডার্ন রিভিউ, সাইন্স এণ্ড
কালচার, বারেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটিতে শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছিল। কালিদাস বাবু
রচিত প্রবন্ধগুলি থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগণা ও সুন্দরবনের অতীত সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া
যায়। আমাদের জেলার ইতিহাস ধরে রাখতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়।
বেশকিছু দুর্মূল্য গ্রন্থ লিখে যান যা আজ নিম্নগাঙ্গেয় দক্ষিণ বঙ্গের সংস্কৃতি ও ইতিহাস
জানতে আকর গ্রন্থ হয়ে আছে। তাঁর দক্ষিণ ২৪ পরগণার অতীত, হে অতীত কথা কও, সুন্দরবনের
প্রাচীন ইতিহাস, আদিগঙ্গার ইতিহাস আজকে বহু মানুষ খুঁজে ফেরে শুধু অপ্রকাশিত ইতিহাসের
ধারা প্রকট করার জন্য।
মজিলপুরের জমিদার দত্ত পরিবারে ১৮৯৫ সালের
১০ ই ডিসেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সুরেন্দ্রনাথ দত্ত ও মাতা ক্ষীরোদামোহিনী
দাসী। স্থানীয় জে. এম. ট্রেনিং স্কুল থেকে পাশ করে বহড়ু উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা
পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। তারপর কলকাতার কলেজে পড়াশোনা চলাকালীন পিতার মৃত্যু ঘটে
ও জমিদারি দেখার ভার যখন কাঁধে পড়ে, তখন থেকেই শুরু হয় ঐতিহাসিক কালিদাসের পথচলা। তৎকালীন
সুন্দরবনের ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ বিষাক্ত সাপ, হিংস্র পশুর হুঙ্কার উপেক্ষা করে বারবার
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে গেছেন ফেলে আসা সভ্যতার সাথে কথা বলতে। সেসব নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ
মডার্ন রিভিউ, ভারতবর্ষ ও প্রবাসী পত্রিকায় নিয়ম করে বেরোতে থাকায় তাঁর পাণ্ডিত্য চারিদিকে
ছড়িয়ে পড়ল এবং তাঁর সাথে দেখা করতে কলকাতা থেকে অনেকেই আসতে শুরু করলেন তাঁর মজিলপুরের
বাড়িতে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হল দীনেশ চন্দ্র সেন, নীহার রঞ্জন রায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়,
কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ সাঁতরা, হেমেন মজুমদার, অমরকৃষ্ণ চক্রবর্তী, ভূষণ চন্দ্র
নস্কর, অমিয় কুমার বসুসহ বহু বিদেশী। যাঁদের নাম বললাম তাঁদের অনেকের লেখা ইতিহাস পরবর্তী
প্রজন্ম পড়েছে বা জেনেছে। কিন্তু এই ইতিহাস লেখা বা ঐতিহাসিক তৈরি করার পিছনে যিনি
ইতিহাসে জায়গা নিয়েছেন তিনি আর কেউ নন, প্রখ্যাত কালিদাস দত্ত। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে চোয়ালের
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জীবনযুদ্ধে লড়াই করতে করতে ১৯৬৮ সালের ১৪ ই মে ভোররাতে তিনি
ইহলোক ত্যাগ করেন।
তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে জয়নগর মজিলপুরে প্রত্নতাত্ত্বিক
কালিদাস দত্ত স্মৃতি সংগ্রহশালা ও কালিদাস দত্ত স্মৃতি সংগ্রহশালা (ভ্রাম্যমাণ) নামে
দুটি সংস্থা গঠিত হলেও শেষেরটি সম্ভবত আর দেখা যায় না। তাঁর লেখা পড়তে পড়তে আজ থেকে
তিনশত বছরের পূর্বের আদিগঙ্গার স্রোতধারা যেন আমি দেখতে পাই। ঘোষগঙ্গা বা মিত্রগঙ্গার
পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন এই তো সেই চলমান গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে আছি। গঙ্গার দুই তীরে
সমৃদ্ধ সভ্যতা আর বিদেশী শক্তির দাপাদাপি সব যেন সত্যি হয়ে মনকে বড় ভারাক্রান্ত করে
তোলে। আজও মন খুঁজে ফেরে তাঁকে আর তাঁর সৃষ্টিকে।
সেই বিখ্যাত মানুষ কালিদাস দত্তের বাড়ি সংস্কার করে একটি ইতিহাসের স্মারক সমৃদ্ধ বা তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে সাজিয়ে একটি পৃথক সংগ্রহশালা মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও এখানে উমেশচন্দ্র দত্তের বাড়ি সংস্কার করেও জনগণের উদ্দেশ্যে খুলে দেওয়া যেতেই পারে। অবশ্যই করে তাঁদের পরিবারের সম্মতি নিয়ে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি সংগ্রহশালা নির্মাণ করা যেতেই পারে।
শিবনাথ শাস্ত্রীর বাড়ি
রত্নগর্ভা জয়নগরের কৃতি সন্তান পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী। তাঁর শিক্ষা, সংস্কৃতি কলিকাতা ও রাজপুর সোনারপুরকে কেন্দ্র করে হলেও তিনি জয়নগরে শিকড়ের টান অনুভব করতেন। তাই তিনি আদি গঙ্গা ধরে নৌকা করে জয়নগরে মজিলপুরের বাসস্থানে যাতায়াত করতেন। তাঁর কথায়, ‘এইরূপ জনশ্রুতি প্রচলিত আছে যে, জাহাঙ্গীর বাদশার সময় যখন রাজা মান সিং যশোর নগর আক্রমণ করেন, তখন চন্দ্রকেতু দত্ত নামক একজন সম্ভ্রান্ত কায়স্থ ভদ্রলোক সপরিবারে যশোর বিভাগ হইতে পলায়ন করিয়া ঐ চড়ার উপরিস্থিত গ্রামে (মজিলপুর) সুন্দরবনের ভিতরে আসিয়া বসবাস করিয়াছিলেন। তাঁহার সহিত তাঁহার যজ্ঞ পুরোহিত ও কুলগুরু শ্রীকৃষ্ণ উদ্গাতা নামক এক ব্রাহ্মণ আসিয়া তাঁহারই প্রদত্ত এক সামান্য ভূমিখণ্ডে আপনার বাসস্থান নির্দেশ করেন। তিনি আমাদের পূর্বপুরুষ’। তিনি বাংলার নবজাগরণে, স্বাধীনতা আন্দোলনে এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে জয়নগর মজিলপুর ছাড়িয়ে সারা বাংলায় সাফল্যের সাথে তাঁর দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর বসতবাটি সংস্কার করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করি, যেখানে তাঁর গ্রন্থ, জীবন ও কর্ম নিয়ে চিত্রপট, তাঁর সংস্কার ও দর্শন তুলে ধরা হবে।
বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্যের বাড়ি
জয়নগর শুধু শিক্ষা ও
সংস্কৃতিতে অবদান রেখেছে তাই নয়, তাঁদের যুবচেতনার আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে ছিটিয়ে
পড়েছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে। এমন একজন বাংলা মায়ের দামাল ছেলে জয়নগর
মজিলপুরের বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য। ১৯৩১
সালে ২৭ শে জুলাই জয়নগর-মজিলপুরের ছেলে বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য নিজের নাম
পরিচয় গোপন রেখে ঐতিহাসিক রাইটার্স অলিন্দ যুদ্ধের অন্যতম নায়ক দীনেশ গুপ্তের
ফাঁসির হুকুমদাতা বিচারক গার্লিক কে নিধন করে ইতিহাসের পাতায় জয়নগর-মজিলপুর কে
উজ্জ্বল করে রেখেছেন।
তাঁর অকালে প্রাণ বিসর্জনকে কুর্নিশ জানাতে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার জেলাসদর আলিপুরে
একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। গুরুত্ব বুঝেই ঐ বছরের ১৮ ই অক্টোবর নেতাজী সুভাষ
চন্দ্র বোস জয়নগর-মজিলপুরে এসেছিলেন দুর্গা পুজার অষ্টমীর দিন মজিলপুরের বোসপাড়ার
ব্যায়াম সমিতির বার্ষিক সাধারন সভায় বক্তৃতা দিতে। এখানেই বোঝা যায় ভারতের
স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়নগর-মজিলপুরের গুরুত্ব কতখানি ছিল। তখনও পর্যন্ত কেউ জানতেন
না এই ব্যায়াম সমিতির ছেলে কানাইলাল কতবড় ঘটনা ঘটিয়েছেন। এই হল ত্যাগ, দেশমাতৃকার চরণে
আত্মবলিদানের নমুনা।এই
ইতিহাস কি কম শিহরন জাগায়! আজকের দিনে বসে আমরা কেউ কি ভাবতে পারি যে এই মাটিতে
ভারত অধিনায়ক নেতাজী সুভাষ এসে বিপ্লবের বীজ বুনে দিয়ে গেছেন। আজকের যুবসমাজকে
স্বাধীনতার ইতিহাস পড়তে হবে, জানতে হবে দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনে অতীতের ভাবধারা।
কাদের আত্মবলিদানের ফসল হিসাবে আমাদের এই বর্তমান ভারতবর্ষ হাতে পাওয়া। আমাদের মনে
রাখতে হবে তাঁদের স্মরণ করতে গিয়ে কোনভাবে অসম্মান না করে ফেলি। আমরা সেই
কানাইলালের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে তাঁর বসতবাটি বা তার পাশে কোন একটি স্থানে
একটি স্মৃতিশালা তৈরি করে তাঁর কর্ম ও জীবন বলিদানের ইতিহাস তুলে ধরলে তা মানুষের
কাছে তথা ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীদের কাছে এক নতুন অক্সিজেন প্রদান করবে বলে মনে করি।
বিষবৃক্ষ উপন্যাসের পটভূমি
সাহিত্যের মানুষ যারা তাঁরা যদি একবার জানতে পারেন যে
তাঁদের পছন্দের ঔপন্যাসিক বা সাহিত্যিকের এক অতুলনীয় সৃষ্টির পটভূমি আজও বিদ্যমান,
তাহলে তাঁরা সেই স্থান একবার হলেও ঘুরে দেখে মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পান। এমনই
একটি বিখ্যাত উপন্যাস বিষবৃক্ষ যা সাহিত্য সম্রাটের কলমের নির্যাস হলেও তাঁর
পটভূমি লুকিয়ে এই মজিলপুরের দত্ত বাড়ির জমিদারি। আদিগঙ্গার মজে যাওয়া খাতে
মজিলপুরের বিখ্যাত দত্ত পরিবারের জমিদারি ও হাঁকডাক ইতিহাসে উল্লেখ আছে। তবে এরা
খুব অত্যাচারী ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করে জমিদারি খতম করে। বিশেষ করে দাসী বা
বাঈদের প্রতি এদের অমানবিক অত্যাচার এই দত্তরাজ সমাপ্তির অন্যতম কারণ বলে মনে করে
স্থানীয় মানুষ। দত্ত বংশের উজ্জ্বল সন্তান অনেকেই ছিল এবং এই বংশের সঙ্গে একাধিক
ভালো মানুষের পরিচয় বা আনাগোনার কথা শোনা যায়। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায় যখন বারুইপুরের সাবজুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে আসেন তখন এখানে এসে
দত্ত পরিবারে বেশ কিছুদিন ছিলেন এবং তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘বিষবৃক্ষ’ রচনার
পটভূমিকা হিসাবে এই দত্ত পরিবারের জমিদারি ও তার আনাচকানাচ কে বেছে নিয়েছিলেন যার
অনেক অংশই আজও উপন্যাসের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সেই দত্ত পরিবারের গাম্ভীর্যতা
হারিয়ে গেলেও সেখানে লালদত্ত ও সাদাদত্ত বাড়িতে দুর্গাপূজার ধুম লাগে। সেই সকল
মানুষদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান বা বাড়ি আজও পর্যটকদের আকর্ষণ করবে বলে মনে করি। শুধু
এর প্রচার ও ব্র্যান্ডিং দরকার।
স্বাধীনতা আন্দোলনে জয়নগর-মজিলপুরের সুসন্তান
ব্রিটিশের করাল গ্রাস থেকে
ভারতমাতার মুক্তির জন্য যে স্বাধীনতার স্বদেশী আন্দোলনের ধারা সারা ভারতে ছড়িয়ে
পড়েছিল তার মধ্যে মহারাষ্ট্র ও অবিভক্ত বাংলাকে এই আন্দোলনের আঁতুড়ঘর বলে মনে করা
হয়। আবার অধুনা পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও মেদিনীপুর জেলার পাশাপাশি তৎকালীন চব্বিশ
পরগণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। অবিভক্ত চব্বিশ পরগণার বিভিন্ন
প্রান্তে আন্দোলন সংগঠিত হলেও জয়নগর-মজিলপুরের অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে
লিপিবদ্ধ। আদিগঙ্গার তীরে অবস্থিত সমৃদ্ধশালী জনপদ জয়নগর-মজিলপুর শিক্ষা সংস্কৃতি
ও স্বদেশী চেতনায় অনেক এগিয়ে ছিল। কেউ বা কলমের খোঁচায় বিপ্লবে অনুপ্রেরনা
জুগিয়েছেন, আবার কেউ সশস্ত্র বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে দেশমাতৃকার জন্য শহীদ হয়েছেন।
জয়নগর-মজিলপুরের সুসন্তানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শিবনাথ শাস্ত্রী, উমেশচন্দ্র
দত্ত,কালিনাথ দত্ত, কানাইলাল ভট্টাচার্য প্রমুখ। ১৮৬৪ সালের বন্যা বা ১৮৮৯ সালের
দুর্ভিক্ষ এই অঞ্চলের যুবকদের মধ্যে স্বদেশী ভাবধারা জাগায়। উমেশচন্দ্র দত্তের
নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল স্বদেশী দ্রব্যসম্ভারের প্রদর্শনী যার ফলে ডায়মন্ডহারবার
মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট হেমচন্দ্র কর ও বারুইপুর মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট সাহিত্য সম্রাট
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে আসেন এলাকার যুবকরা।
জয়নগর-মজিলপুরের এইসব
প্রগতিশীল মানসিকতাসম্পন্ন যুবকদের মধ্যে স্বদেশী চিন্তাভাবনা এই ঘটনার বহু আগে
গড়ে উঠেছিল। আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে ১৮৭৬ সালে যখন ভারত সভা বা Indian
Association প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এখানকার শিবনাথ শাস্ত্রী, উমেশচন্দ্র দত্ত, কালিনাথ
দত্ত প্রমুখ যুক্ত ছিলেন। এক্ষেত্রে বলাবাহুল্য সেই ভারতসভা পরবর্তীকালে ভারতের
জাতীয় কংগ্রেস নামে পরিবর্তিত হয় যা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা
গ্রহণ করে এবং স্বাধীন ভারতের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।
এখানকার যুবসমাজ শুধু ভারতসভায় যুক্ত ছিলেন তা নয় তাঁদের নেতৃত্বে জয়নগর-মজিলপুরে
গড়ে উঠেছিল বহু সংগঠন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘মজিলপুর ব্যায়াম সমিতি’ ও
‘আত্মোন্নতি সমিতি’। এখানে শরীরচর্চা থেকে লাঠিখেলা, ছোরাখেলা ইত্যাদির মাধ্যমে
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুবসমাজকে স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত থাকতেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামে
জয়নগর-মজিলপুরের ভূমিকা আলোচনা করতে গেলে সবার আগে বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্যের
নাম নিতে হয়। এই কানাইলাল ভট্টাচার্যের সমসাময়িক মন্মথ ঘোষ, জীতেন ঘোষ, ভূতনাথ
ভট্টাচার্য, তিনকড়ি দাস, রজনীকান্ত ভট্টাচার্য, কুন্তল চক্রবর্তী, চুনিলাল নন্দী,
ক্ষিতিপ্রসাদ দাস প্রমুখ স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ জড়িত ছিলেন। রজনীকান্ত ওরফে
বাদল স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতায় পাঠ নিতে গিয়ে একই মেসে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য
ও যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গী হন যারা বিখ্যাত বিপ্লবী এম এন রায় ও বাঘাযতীন
নামে খ্যাত। এরা তিঞ্জনে মিলে গড়ে তোলে বিখ্যাত ‘যুগান্তর’ নামে একটি বিপ্লবী
সংগঠন। ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে বেশ কয়েকটি দুসাহসিক স্বদেশী ডাকাতিতে
জয়নগর-মজিলপুরের বাদল-কুন্তল-তিনকড়িদের যুক্ত থাকার কথা জানা যায়। অর্থাৎ সেইসময়
এই অঞ্চলে বেশকিছু যুবক স্বাধীনতা সংগ্রামে আপোষহীন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে
পড়েছিলেন। কেউ কারাবরণ করেন তো কেউ প্রাণ বিসর্জন দেন।
১৯৩১ সালে ২৭ শে জুলাই
জয়নগর-মজিলপুরের ছেলে বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য নিজের নাম পরিচয় গোপন রেখে
ঐতিহাসিক রাইটার্স অলিন্দ যুদ্ধের অন্যতম নায়ক দীনেশ গুপ্তের ফাঁসির হুকুমদাতা
বিচারক গার্লিক কে নিধন করে ইতিহাসের পাতায় জয়নগর-মজিলপুর কে উজ্জ্বল করে রেখেছেন।
গুরুত্ব বুঝেই ঐ বছরের ১৮ ই অক্টোবর নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস জয়নগর-মজিলপুরে
এসেছিলেন দুর্গা পুজার অষ্টমীর দিন মজিলপুরের বোসপাড়ার ব্যায়াম সমিতির বার্ষিক
সাধারন সভায় বক্তৃতা দিতে। এখানেই বোঝা যায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে
জয়নগর-মজিলপুরের গুরুত্ব কতখানি ছিল। তখনও পর্যন্ত কেউ জানতেন না এই ব্যায়াম
সমিতির ছেলে কানাইলাল কতবড় ঘটনা ঘটিয়েছেন। এই হল ত্যাগ,দেশমাতৃকার চরণে
আত্মবলিদানের নমুনা।
লবণ সত্যাগ্রহ বা অসহযোগ আন্দোলনের সময়ও এখানকার অনেকেই প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কারাবরণ, মৃত্যুবরণ, দেশান্তর হয়ে বা ব্রিটিশ পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হয়েছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখ্য মন্মথ ঘোষ, জীতেন ঘোষ, ক্ষিতিপ্রসাদ দাস,দুর্গাদাস ভট্টাচার্য, ভূতনাথ ভট্টাচার্য, তিনকড়ি দাস ও শচীন বন্দ্যোপাধ্যায়। জয়নগর-মজিলপুর তখন একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম,কলকাতার সঙ্গে এখনকার মতো রেলের যোগাযোগ ছিল না। তা সত্ত্বেও শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এর বর্তমান ও অতীত খুবই গৌরবোজ্জ্বল। সমাজসংস্কারক ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সমাবেশে জয়নগর-মজিলপুরের গুরুত্ব প্রাক-স্বাধীনতা কাল থেকে আজও সমাদৃত। এখানকার অনেক সত্যনিষ্ঠ ও নির্ভীক দেশমাতৃকার দামাল সন্তান বিনা স্বার্থে দেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার জন্য যে বলিদান দিয়েছেন তাতে আদি গঙ্গার তীরে এই সমৃদ্ধশালী জনপদ জয়নগর-মজিলপুরের মুকুটে স্বর্ণপালক তুলে দিয়েছেন। এইসকল মহান মানুষ, দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনে যাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাঁদের জীবন ও দর্শন তুলে ধরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জয়নগরের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধশালী করা যায়।
১০৮টা নরমুণ্ড দিয়ে পরিবৃত্ত থাকেন মা করুণাময়ী
এবার আলোচনায় উঠে আসে যে মন্দির বা শক্তিপীঠ
তা জয়নগরের মধ্যে অবস্থিত না হলেও জয়নগরের অদূরেই দক্ষিণ বিষ্ণুপুরে অবস্থিত এক জাগ্রত
মন্দির বলে পরিগণিত। বৃহত্তর জয়নগর নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই মন্দির ব্রাত্য রাখা চলে
না। শতাধিক বছর আগে দক্ষিণ ২৪ পরগণার মন্দির বাজার থানার দক্ষিণ বিষ্ণুপুরে শ্মশান
লাগোয়া জঙ্গলের মধ্যে মা কালীর মন্দির স্থাপন করা হয়েছিল৷ সেই মন্দিরে করুণাময়ী মায়ের
পুজো শুরু করেছিলেন এলাকার প্রখ্যাত তান্ত্রিক মণিলাল চক্রবর্তী। মায়ের সাধক মণিলাল
স্বপ্নাদেশ পেয়ে মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করেন। মা কালীর স্বপ্নাদেশেই
বিভিন্ন জায়গা থেকে ১০৮টি নরমুণ্ড জোগাড় করেন তিনি। যা মায়ের মূর্তির চারিদিকে সাজিয়ে
রেখেই আরাধনা শুরু করেছিলেন মণিলাল বাবু। পাশাপাশি পঞ্চমুণ্ড দিয়ে তৈরি আসনে বসেই মায়ের
পূজা অর্চনা করতেন তিনি।
মায়ের সেবার কাজে তাঁকে সাহায্য করতেন ভাই
ফণীভূষণ চক্রবর্তী। তিনিও ছিলেন মায়ের সাধক৷ কয়েক বছর পর জটিল রোগের কারণে মৃত্যু হয়
মণিলাল বাবুর। এরপর তার ভাই মায়ের সেবার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কথিত আছে মণিলাল বাবুর
তুলনায় ফণীভূষণ বাবু আরও অনেক বড় তান্ত্রিক ছিলেন। সরাসরি মা করুণাময়ীর কথা শুনতে পেতেন
তিনি। মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতি অমাবস্যায় মায়ের পুজো হত জাঁকজমক পূর্ণভাবে।
সেই পুজোতে পাঁঠা বলিও দেওয়া হত। কিন্তু একদিন মায়ের সাধক তান্ত্রিক ফণীভূষণ চক্রবর্তী
স্বপ্নাদেশ পান মা করুণাময়ী আর বলি চাইছেন না। সেই কারণে বন্ধ হয় এই মন্দিরে বলি প্রথা।
তবে পুজোতে প্রয়োজন রক্তের৷ তাই বলির জন্য আনা পশুর কানের পাশ থেকে একটু রক্ত নেওয়া
হত।
এই ভাবেই বছরের পর বছর ধরে দক্ষিণ ২৪ পরগণার
মন্দির বাজার থানার দক্ষিণ বিষ্ণুপুর এলাকায় এই মা করুণাময়ীর পুজো হয়ে আসছে। বর্তমানে
মতিলাল বাবুর ছেলে শ্যামল চক্রবর্তী নিজেই দায়িত্ব নিয়ে মায়ের পুজা অর্চনা করেন। তবে
এখন আর প্রতি অমাবস্যায় বড় করে মায়ের পুজো না হলেও বিশেষ বিশেষ তিথিতে মায়ের পুজো হয়
ধুমধাম করে। প্রতি অমাবস্যা তিথিতে এই মন্দিরে এখনও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তান্ত্রিকরা
আসেন তন্ত্র সাধনা করতে। অমাবস্যার রাতটা কাটিয়ে পরদিন ভোরেই চলে যান তাঁরা। শ্মশান
ও মন্দির লাগোয়া বটগাছের তলায় বসে চলে তন্ত্র সাধনা। শ্মশান পেরিয়ে মন্দিরে যেতে হয়
বেশ কিছুটা জঙ্গল পথ পেরিয়ে, যেখানে এখনও গা ছমছমে পরিবেশ রয়েছে।
এলাকার মানুষের মতে দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের এই কালী মন্দিরের মা করুণাময়ী অত্যন্ত জাগ্রত। ভক্তিভরে মাকে ডাকলে মা সাড়া দেন। মায়ের কাছে ভক্তিভরে যাই চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায় বলে দাবি সাধারণ মানুষের। মা করুণাময়ী সকলের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেন। তাই প্রতিদিন এই মায়ের মন্দিরে নামে ভক্তদের ঢল। মায়ের কাছে মানত করে ঢিল বাঁধলে ও ভক্তি ভরে মাকে ডাকলে কেউ খালি হাতে ফেরে না বলে জানান এলাকাবাসী৷ এই মন্দির লাগোয়া রয়েছে দক্ষিণ বিষ্ণুপুর শ্মশান। সেই শ্মশান ও খুবই জাগ্রত বলে দাবি করেন এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি প্রতিদিন এই শ্মশানে শব আসা চাই৷ নাহলে শ্মশানের কয়লা আপনি আপনিই জ্বলে ওঠে। একাধিকবার এই ঘটনা ঘটেছে। আদি গঙ্গার তীরে এই শ্মশান ও মা করুণাময়ীর মন্দির ভক্তবৃন্দের কাছে অত্যন্ত পুণ্যস্থান বলেই বিদিত হয়ে রয়েছে।
আদিগঙ্গা, পরিবেশ ও জয়নগরের গুরুত্ব
সারা
ভারতবাসীর আবেগ জড়িয়ে আছে এই আদিগঙ্গার সাথে। সেই গঙ্গা যখন এই স্থানকে একটা সময়
সিঞ্চিত করেছে তাঁর অপার করুণাধারায়। সেই গঙ্গা মুখ ফিরিয়ে নিলেও তাঁর পবিত্রতা
স্থানে স্থানে বিদ্যমান। আমরা একবার যদি ভেবে দেখি যে ডায়মন্ডহারবারের মত আমাদের
এখানে যদি গঙ্গা আজও প্রবাহিত হত, আমরা যদি জয়নগর মজিলপুরের বাসভূমির ছাদে বসে
গঙ্গা দর্শন করতে পারতাম, তাহলে ডায়মন্ডহারবার থেকে মানুষ ছুটে আসতেন আমাদের এই
গঙ্গার পাড়ে অমলিন বাতাস পেতে। প্রাণখুলে শ্বাস নিতে। সেই গঙ্গা মুর্শিদকুলি খাঁর
কারণে হোক আর কালের নিয়মে হোক আমাদেরকে বঞ্চিত করে চলে গেছে। কিন্তু যেটুকু রয়েছে
তা সংস্কার করে আমরা তার চারিদিকে সুন্দর করে সাজিয়ে ভ্রমণপিপাসু মানুষের একটু
অবকাশের ঠিকানা হয়ে উঠতে পারে। পূর্বেই বলেছি একটা সভ্যতার বিকাশ বা তার উন্নয়নে
নদীর কতটা ভূমিকা থাকে। তাই এই গঙ্গাকে মাতৃজ্ঞানে রক্ষা করতে হবে। স্থানে স্থানে
বোর্ড বসিয়ে ইতিহাসের ছেঁড়া পাতা সাঁটিয়ে মানুষের ভাবের ঘরে চুরি করতে হবে। গঙ্গা
যার দখলে থাকুক, সেই গঙ্গার ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক মাধুর্য অস্বীকার করার উপায় নেই।
সময়ের সাথে সাথে বিশ্বপ্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে
মানুষের অপরিসীম লোভ ও লালসার বলি হয় প্রকৃতি ও প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান। সেই
প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে অন্যতম হল নদী, কারণ নদী মানবসভ্যতার বিকাশে যে অপরিসীম
প্রভাব রাখে তা ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায়। কৃষি থেকে শিল্প, শিক্ষা থেকে সংস্কৃতি
আর বিনোদন থেকে সংস্কার সব নদীকে জড়িয়ে। এমনকি লোকসংস্কৃতির অন্তরালে সব থেকে বড়
কাজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে মৃত্যুর পর গঙ্গাপ্রাপ্তি অর্থাৎ যে শ্মশানে মানুষ বিলীন
হয় সেটাও নদীর তীরে। এখন সেই নদীর যদি গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটে তা সভ্যতার কাছে প্রশ্ন
রেখে যায়। নদী নিজে থেকে মরে না, মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারে, গতি পরিবর্তন করতে পারে
কিংবা মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে নদীকে মৃতপ্রায় করে তোলে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার
একাধিক নদী আজ লুপ্ত বা লুপ্তপ্রায়। অনেক নদীর নাম আজকের প্রজন্ম জানেন না। সেই
নদীর অস্তিত্ব বা তার মাতাল রূপ আজ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কিংবা নদীর বুকে চরা,
নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর বুকে মৎস্যচাষ বা নদীর বুকে সেতু তৈরি করতে গিয়ে কোন কোন
নদীকে অচিরেই শেষ করেছে মানুষ। মাতলা, পিয়ালি বা বিদ্যাধরী, সরস্বতী কিংবা
কালনাগিনী নদী উল্লেখযোগ্য। তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জায়গা রাখে আদিগঙ্গা।
আদিগঙ্গা এমন একটি হারিয়ে যাওয়া নদী যা মানুষ বইয়ের পাতায় খুঁজে পায়।
নামের মধ্যেই আমরা এই নদীর অস্তিত্ব সংকট
প্রকাশ্যে আনি। কারণ গঙ্গা বলে কোন নদী এখান থেকে প্রবাহিত হত। আজ হয়তো একই নামে
অন্য কোথাও থেকে সেই একই ধারা প্রবাহিত হয় বলে সেই হারিয়ে যাওয়া স্রোতকে মৌলিকতা
প্রদান করতে তার আগে একটা আদি কথা জুড়ে দেওয়া হয়। নইলে বিশ্বায়নের বাজারে হয়তো
অন্যভাবে তুলে ধরতে হত। পুরাণ থেক ভূগোল, ইতিহাস থেকে সমাজতত্ত্ব সর্বত্র গঙ্গার
উৎপত্তি, প্রবাহ ও মিলনস্থল নিয়ে একমতে পৌঁছেছেন। তবে সেই ভগীরথের আনা গঙ্গা সময়ের
হাত ধরে তার গতিপথ অনেক জায়গায় স্থানান্তর করেছে। আসলে গোমুখ থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত
পুরো প্রবাহকে আমরা গঙ্গা বলে জানলেও এই প্রবাহের কোথাও অলকানন্দা, তো কোথাও
ভাগীরথী, কোথাও আবার পদ্মা তো কোথাও আবার হুগলী, কোথাও আদিগঙ্গা তো কোথাও আবার
কাটাগঙ্গা নামে পরিচিত হয়েছে। তাই আমরা আদিগঙ্গা নিয়ে আলোচনা করতে যাবার আগে একটু
ইতিহাসটা জেনে নেব যে কিভাবে সেই আদিগঙ্গার মৃত্যু ঘটল।
বঙ্গে ভাগীরথীর প্রকৃত উৎস নিয়ে গবেষকদের মধ্যে
মতান্তর থাকলেও মনে করা হয় যে ফারাক্কা থেকে প্রায় ৪২ কিমি দক্ষিণপূর্ব দিকে এবং
সুতি থেকে প্রায় ১৫ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত মুর্শিদাবাদের গিরিয়া বা পত্নীতলা থেকে
একটু দক্ষিণে খেজুরতলা বা মিঠিপুর গ্রামে গঙ্গা ভাগীরথী ও পদ্মা নামে দুটি শাখায়
বিভক্ত হয়েছে এবং বর্তমানে সেটাই উৎস। পদ্মা মুর্শিদাবাদ জেলার সীমান্ত বরাবর
এগিয়ে জলঙ্গীর কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আর ভাগীরথী অর্থাৎ বাংলায় আমরা যাকে
গঙ্গা বলে জানি সেই নদী দক্ষিণ দিকে জলঙ্গী, শান্তিপুর, কাটোয়া, গুপ্তিপাড়া, ত্রিবেণী,
সপ্তগ্রাম, ভাটপাড়া, কাকিনাড়া, মহেশ, খড়দহ, সুখচর, আড়িয়াদহ, চিতপুর, কলকাতা,
কালীঘাট, চূড়াঘাট, বারুইপুর, দক্ষিণ বারাসাত, ছত্রভোগ, বদরিকাকুণ্ড, হাতিয়াগড়,
চৌমুখী, সপ্তমুখী হয়ে প্রায় ৫০০ কিমি পথ অতিক্রম করে সাগরে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু
কলকাতার পর থেকে কালীঘাটের যে আদিগঙ্গা তা সময়ের সাথে সাথে চুরি হয়ে যেতে থাকে
মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও লালসা পূরণের বলি হয়ে। ইতিহাসে উল্লেখ, ১৭৫০ সালে
মূলত বানিজ্যিক সুবিধার কারণে নবাব আলিবর্দি খিদিরপুর থেকে হাওড়ার সাঁকরাইল
পর্যন্ত খাল কেটে ভাগীরথীর জলপ্রবাহকে হাওড়ার বেতড়ের নিকটে সরস্বতী নদীর পরিত্যক্ত
খাত দিয়ে সাগরের দিকে চালিত করে। ফলে আদিগঙ্গা দ্রুত মজে যেতে থাকে। এই কারণে
খিদিরপুরের পশ্চিমে হুগলী নদীকে আজও স্থানীয় লোকেরা কাটাগঙ্গা বলে এবং নদীর এই
অংশের জল কোন ধর্মীয় কাজে লাগে না। পরবর্তীকালে ১৭৭৫ সালে স্যার মেজর উইলিয়াম টালি
এই আদি গঙ্গার মজে যাওয়া খাতকে প্রায় আট মাইল সংস্কার করলেও তা গড়িয়ার পর থেকে
দক্ষিণে দিকে না গিয়ে পূর্বদিকে নতুনভাবে নয় মাইল কেটে শামুকপোতা পেরিয়ে
বিদ্যাধরীর সাথে যুক্ত করে দেন। ফলে আদিগঙ্গার দক্ষিণের স্রোত সেইসময় থেকে ধীরে
ধীরে হারাতে শুরু করে। যদিও এখন দক্ষিণ দিকে বজবজ, ফলতা, রায়চক, ডায়মন্ডহারবার হয়ে
ভাগীরথী সরস্বতীর খাত বরাবর হুগলী নদী নামে সাগরে মিশেছে।
কারণ, খেজুরতলা থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত পুরো
প্রবাহকে ভাগীরথী বলা হয় না। নদীয়া জেলার নবদ্বীপের দক্ষিণ থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত
এই প্রবাহ হুগলী নদী নামে পরিচিত। সাধারণত মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া জেলাতে এই শাখার
প্রায় ২২০ কিমি খাত ভাগীরথী নামেই পরিচিত এবং বাকি ২৮০ কিমি পথ হুগলী নদী নামে
পরিচিত হলেও মতান্তরে অজয় নদের আগে বিষ্ণুপুর পর্যন্ত ভাগীরথী বলে ধরা হয়। আবার
অনেকেই মনে করেন জলঙ্গী নদী এসে যেখানে ভাগীরথীর সাথে মিলিত হয়েছে সেখান থেকে
হুগলী নদীর শুরু। কিন্তু আমাদের কাছে একটা বিষয় পরিষ্কার নবদ্বীপ, মায়াপুর থেকে
মোহনা পর্যন্ত যেহেতু জোয়ারভাটা খেলে, তাই সেই খাতকে হুগলী নদী নামে ডাকা যায়।
কিন্তু তার উত্তরের নদী ভাগীরথীতে ফারাক্কা ব্যারেজ বা ফিডার ক্যানেল করার আগে
শুখা মরশুমে জল থাকত না। কারণ এই নদী হিমালয় থেকে আগত বরফগলা জলে পুষ্ট গঙ্গার জল
ও বেশকিছু বৃষ্টির জলে পুষ্ট উপনদী তথা বাঁশলই, পাগলা, দামোদর, অজয়, ময়ূরাক্ষী,
জলঙ্গী ও চূর্ণীর জলে সম্পৃক্ত হয়।
ভ্যান ডেন ব্রুক ও জেমস রেনেলের মানচিত্র লক্ষ্য করলে আমরা
আদিগঙ্গার অবস্থান লক্ষ্য করতে পারি। বর্তমান মানচিত্রে সাঁকরাইলের দক্ষিণ দিকে
বজবজ, ফলতা, রায়চক, ডায়মন্ডহারবার হয়ে ভাগীরথী সরস্বতীর খাত বরাবর হুগলী নদী নামে
সাগরে মিশেছে। এই প্রবাহ
কিন্তু ১৭৭৬ সালে প্রকাশিত জেমস রেনেল সাহেবের মানচিত্রে দেখা গেলেও তারপর থেকে
প্রকাশিত মানচিত্রে বারবার পরিবর্তন হয়েছে উপরে উল্লিখিত নদীর প্রবাহপথ। বর্তমানে
আমরা ক্ষেত্রসমীক্ষা করতে গিয়ে দেখেছি যে টালিনালার উপর দিয়ে মেট্রোরেলের
সম্প্রসারণের মধ্যে দিয়ে সভ্যতার দাপাদাপিতে টালি সাহেবের শেষচেষ্টাকে শেষ করা
হয়েছে। দক্ষিণের রাজপুর থেকে বারুইপুর হয়ে সূর্যপুর পর্যন্ত গঙ্গার সেই প্রবাহপথে
স্থির জলে পরিপূর্ণ পানার অবস্থান, যদিও সরকারী উদ্যোগে তা বাইপাস বরাবর সংস্কার
করা হয়েছে। আর দক্ষিণ বারাসাত থেকে বিষ্ণুপুর পর্যন্ত সেই গঙ্গার বুকে থেকে থেকে
মানুষের অধিকারে বিভক্ত হয়ে পুষ্করিণীসম অবস্থান করছে। আদিগঙ্গা এখন ঘোষগঙ্গা,
বোসগঙ্গা, মিত্রগঙ্গা ইত্যাদি নামে অবস্থান করছে। গঙ্গা এখানে ব্যক্তি বা
পরিবারকেন্দ্রিক মালিকানার জেরে জেরবার হয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুখ দেখাতে
পেরেছে শুধু পদবীর শেষে গঙ্গা নামটা অনুগ্রহ করে দিয়ে। মাঝে ধপধপি থেক ধামুয়া হয়ে
বারাসাত পর্যন্ত সেই গঙ্গা যেন চোরাস্রোতে হারিয়ে গেছে। সত্যি ভাবতে অবাক লাগে যে
আজ থেকে পাঁচশত বছর আগে এখান থেকে প্রবাহিত হত গঙ্গার দুরন্ত প্রবাহ। এখানেই
বানিজ্যিক জাহাজ ভিড় করতো, মগ বা পর্তুগীজ জলদস্যুদের আগমন ঘটত। এই গঙ্গার তীর ধরে
একের পর এক সভ্যতার বিকাশ লাভ করেছিল। এই গঙ্গার তীরে গড়ে উঠেছিল জেলার শতাব্দী
প্রাচীন জয়নগর মজিলপুর পৌরসভা। আবার এই গঙ্গার তীর ধরে বাংলা ও বাঙালীর আবেগ তথা
প্রেমের ঠাকুর শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু এগিয়ে এসেছিলেন নীলাচলে যাবেন বলে। আজ আর
কিছুই খুঁজলে পাওয়া যায় না। তবে ইতিহাস তো কথা বলে। তাই সেই হারিয়ে যাওয়া নদীর
ইতিহাস বা অস্তিত্ত্ব খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখি যে আদিগঙ্গার তীর ধরে মন্দির ও
শ্মশানের অবস্থান। সেই কালীঘাট থেকে মুড়িগঙ্গা পর্যন্ত একাধিক শ্মশান ও মন্দিরের
অবস্থান।
আজকের বৃহত্তর কলকাতার অংশবিশেষ তথা আদিগঙ্গার
তীরে বৈষ্ণবঘাটা যেমন মহাপ্রভুর স্মৃতি বিজড়িত তেমন বারুইপুরের কীর্তনখোলা শ্মশান
বা অনন্ত পণ্ডিতের বাড়িতে মহাপ্রভুর নিশিযাপন এবং সেখানে আজ এত বছর ধরে অবিরাম
নামকীর্তনে মুখর মহাপ্রভুতলা কিংবা আদিগঙ্গার তীর ধরে হেঁটে আসা পথ দ্বারিক
জাঙ্গাল যা বর্তমানে কুল্পী রোড নামে পরিচিত আর অবশেষে প্রভুর লীলা সমন্বিত
কৃষ্ণচন্দ্রপুরের ছত্রভোগ বা কাশীনগরের চক্রতীর্থ বা জমিদার রামচন্দ্র খাঁ’র
বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ এবং সেখান থেকে মহাপ্রভুর নীলাচলের পথে নিষ্ক্রমণ- সব সেই
গঙ্গার আদি ধারাকে নির্দেশ করে। আবার কালীঘাটের মহাশ্মশান, নিমতলাঘাট,
কেওড়াতলাঘাট, রাজপুর শ্মশান, বারুইপুরের কীর্তনখোলা শ্মশান, ধামুয়ার মুলটি,
হংসগেড়িয়া শ্মশান, দক্ষিণ বারাসাত মহাশ্মশান, দক্ষিণ বিষ্ণুপুর মহাশ্মশান,
চক্রতীর্থ ছাড়াও শতাধিক ছোট ছোট শ্মশানের অবস্থান আদিগঙ্গার অবস্থানের প্রমাণ দেয়।
আর একটি প্রমাণ হিসাবে পাঠকের কাছে এই প্রবন্ধ তুলে ধরতে চাই, সেটা হল দক্ষিণ
চব্বিশ পরগণার লোকসংস্কৃতিচর্চার যতগুলি ধর্মীয় কাজে গঙ্গাজল বা গঙ্গার মাটি কাজে
লাগে তা কিন্তু এই স্থান থেকে মানুষ আজও ভক্তিভরে তুলে নিয়ে যান। আজও বহুদূর থেকে
মানুষ গঙ্গাস্নান কিংবা মহালয়ার পুণ্যলগ্নে আদিগঙ্গার ধারায়, যতই সে আজ
পুষ্করিণীসম হয়ে যাক না কেন সেখানেই ভক্তিভরে স্নান করে নিজেকে ধন্য করেন।
অন্যদিকে কাটাগঙ্গার স্রোত দুরন্ত গতিতে রায়চক, ফলতা, ডায়মন্ডহারবার, কুল্পি হয়ে
প্রবাহিত হলেও সেখানে কেউ স্নান করে পুণ্য অর্জন করেন না। এখানেই আদিগঙ্গার আদি
সত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ। এই স্নান আবার দেখা হাওড়ার বেতড়ের আগে স্থানে স্থানে সে
বাবুঘাট হোক আর দক্ষিণেশ্বর হোক কিংবা নবদ্বীপ সর্বত্র ভক্তির পুণ্যস্নান চলে।
চলমান নদী হারিয়ে গেলেও সেই নদীকে কেন্দ্র করে সভ্যতার আনাচে কানাচে যে সংস্কৃতি
ছিল তা কালের নিয়মে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়।
আজকের লুপ্ত নদী আদিগঙ্গা মুখ ফিরিয়ে নেওয়াতে সভ্যতার উপর
কি প্রভাব পড়ল, সেটার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা গেল যে, নদী যদি একবার মুখ ফিরিয়ে
নেয় তাহলে সেই সভ্যতার উন্নয়ন কিছুটা হলেও থমকে যায়। জেলার প্রাচীনতম পৌরসভা জয়নগর
মজিলপুরের উন্নয়ন ইতিহাসের পাতার সাথে আজকের উন্নয়ন কোনভাবে সামঞ্জস্য বিধান করে
না। একটা সময় দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জয়নগর কে দক্ষিণের নবদ্বীপ বলা হত। এখান থেক
শিবনাথ শাস্ত্রীর মত পণ্ডিত ব্যক্তিরা কলকাতার সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রন করেছেন। এখান
থেকে উঠে এসেছেন নীলরতন সরকার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।
কিন্তু নদীর অভিমুখ ঘুরিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ফলতা, রায়চক,
বজবজ, ডায়মন্ডহারবার এর উন্নয়ন ঈর্ষার দাবী রাখে। তাই সভ্যতাকে বাঁচাতে সভ্যতার
উপাদানকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। আজকের আদিগঙ্গা বেদখল হয়েছে, স্থানে স্থানে বেআইনি
নির্মাণ গড়ে উঠেছে কিংবা কোথাও কোথাও নোংরা জঞ্জালে পরিপূর্ণ করে ফেলেছে মানুষ।
পরিবেশকর্মীদের শত চিৎকারেও এই নদীর গুরুত্ব মানুষকে বোঝানো যায় নি।
একবার
ভেবে দেখুন তো এই যে হাজার হাজার বছর
ধরে যে নদী প্রবহমান, ইতিহাস যাকে সভ্যতার জন্ম থেকে বিকাশ পর্যন্ত সঙ্গে পেয়েছে সেই
নদী যদি কোনদিন থেমে যায়, কিংবা গতি হারিয়ে থেমে যায় তাহলে এই উন্নত সভ্যতার মানুষ
এই নদীকে আর আগের মতো একে নদী না বলে মা গঙ্গা বলা বা প্রণাম করা, স্নান করার মতো আদিখ্যেতা
করতে যাবে? যাবে না। ইতিহাস তাই বলে। দুই সরস্বতী হারিয়ে গেল, আদি গঙ্গা হারিয়ে গেল।
কেউ মনে রাখে নি, পরের প্রজন্ম তো নয়। শুধু একটা প্রত্নতাত্ত্বিক ছাপ পড়ে থাকবে যে
এক কালে এই স্থান থেকে গঙ্গা নদীর চলাচল ছিল। মানুষ স্বার্থপর, তার স্বার্থে নদী কেন
সকল প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে মানুষ হয়ে মানুষকে করেছে শোষণের উপাদেয়। পড়ে
থাকে আবদ্ধ জলাশয় হয়ে খাল বিল কিংবা মিত্র গঙ্গা, ঘোষ গঙ্গা নাম নিয়ে কারো কারোর পৈতৃক
সম্পত্তির স্মারক হিসাবে।
আজ এই গঙ্গা যদি তার নিজস্ব গতি হারিয়ে স্থবির হয়ে পড়ে তাহলে হয়তো মিলেনিয়াম পার্ক থেকে এক দৌড়ে হাওড়া স্টেশনে ট্রেন ধরা যাবে। সবাই কেমন সবাইকে কাছে পাবে, আনন্দ হবে। ওপারের ব্যক্তি আর এপারের ব্যক্তির সর্বসুখ নিয়ে হতাশ না হয়ে চলে যাবে প্রিন্সেপঘাট থেকে শিবপুর, চলুন দেখে নিই কি হতে পারে। দক্ষিণ দিক বরাবর মেটিয়াবুরুজ থেকে সাঁতরাগাছি, বাটানগর থেকে সাঁকরাইল, পুজালি থেকে সোজা উলুবেড়িয়া, বুরুল থেকে গড়চুমুক বা আটান্নগেট যার মাঝে দামোদরের ধারা, ফলতা থেকে শ্যামপুর যেখানে আগে পুরানো দামোদর এসে মিলেছিল, আবার নুরপুর বা রায়চক থেকে গাদিয়ারা বা গেওখালি যাদের মাঝে রূপনারায়ণ নদী প্রবাহিত, ডায়মন্ডহারবার থেকে কুঁকড়াহাটি, কুলপি থেকে হলদিয়া, নিশ্চিন্তপুর থেকে নয়াচর-নন্দীগ্রাম যদিও এখানে হলদি নদী গঙ্গাতে মিশেছে, কাকদ্বীপ থেকে ঘোড়ামারা-সাগরদ্বীপ যাওয়া যাবে পায়ে হেঁটে। আবার এখান থেকে উত্তর দিকে এগোলে কুমোরটুলি থেকে সোজা ঘুসুরি, বরানগর থেকে বেলুরমঠ, দক্ষিনেশ্বর থেকে এক দৌড়ে বালি উত্তরপাড়া, ব্যারাকপুর থেকে বৈদ্যবাটি, শ্যামনগর থেকে চন্দননগর, নৈহাটি থেকে চিনসুরা সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। প্রায় হাওড়া, হুগলী, নদীয়া, কলকাতা, দুই চব্বিশ পরগণা আর মেদিনীপুর যে গঙ্গার প্রবাহে পৃথক আছে তা মিলেমিশে হবে এক।
মাঝে আর পাগলপারা তরঙ্গিণী
গঙ্গা না থেকে থাকবে একটা শুকনো মরা খাত। ছেলেমেয়ের দল খেলে বেড়াবে, গবাদি পশুর বিচরণক্ষেত্র
হয়ে যাবে, মানুষ তার প্রাতক্রিয়ার সবথেকে বড় জায়গা হিসাবে বেছে নেবে। একে একে শিল্প
কলকারখানা বন্ধ হবে, চাষের জমিতে জলের অভাবে খরা নামবে। তবুও সেদিন মানুষ এই গঙ্গার
মাধুর্যকে স্বীকার না করে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে মানুষ প্রকৃতির লড়াইয়ে মানুষকে রাখতে
চাইবে অনেক উপরে। তাই কি হয় বন্ধু। প্রকৃতির খেয়ালের সাথে তাল মিলিয়ে না চলে কালের
ক্রমবিবর্তনে হারিয়ে গেছে কত বর্ধিষ্ণু সভ্যতা। ঠিক তেমনিভাবে সেদিনের গাঙ্গেয় সভ্যতার
অকাল বিনাশ ঘটবে।
প্রিয় পাঠক, ভারতবর্ষ নদীকেন্দ্রিক
সভ্যতার প্রকাশ আর ভারতের নদীবিন্যাস দেখলে আমরা দেখতে পাই যে উত্তর ভারতসহ সারা ভারতবর্ষে
গঙ্গার মাহাত্ম্য বা তার প্রভাব সর্বজনবিদিত। সেই গঙ্গা আমাদের বঙ্গের মাটি সিক্ত করেছে
হাজার হাজার বছর ধরে। পৌরাণিক কল্পকাহিনীর গল্পগাথা বলে সগর রাজার ষাট হাজার পুত্র
কপিল মুনির কোপানলে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়, তাঁদের বাঁচাতে তাঁদের বংশধর
সগর, অংশুমান,
দিলিপ না
পারলেও দিলিপের পুত্র ভগীরথ গঙ্গাকে কৈলাস থেকে এনেছিলেন এই বাংলায়। কিন্তু
বর্তমান বিজ্ঞানের মানুষ এই তত্ত্ব পুরো না মানলেও তাঁরা গঙ্গার আনয়নকে মানছেন তবে
সেখানে সগর রাজার রাজত্বে কৃষকরা পুত্রসম আর জলাভাবে তাঁদের মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া থেকে
বাঁচাতে ভগীরথ খাল কেটে গঙ্গাকে আনার কথা বলেছেন। সেখানে ভগীরথকে সেই সময়ের সবথেকে
বড় ইঞ্জিনিয়ার বলে মনে করা হয়েছে। যিনি বেঙ্গল বেসিনের ঢাল বা ভূমিরূপের প্রকৃতি বুঝে
গঙ্গার আনয়ন করে দেশকে শস্যশ্যামলা করে তুলেছিলেন। বাঁচিয়েছিলেন ষাট হাজার কৃষক ও তার
পরিবারকে।
হাজার হাজার বছর ধরে প্রবাহিত
গঙ্গার স্বাভাবিক গতিকে স্তব্ধ করে দিতে মানুষ দায়ী। কারন সময়ের সাথে সাথে গঙ্গার বুকে
বাঁধ দিয়ে কিংবা নদীর গতি ঘুরিয়ে, বা নদীর জলকে অন্যকাজে লাগিয়ে নদীর জলের পরিমাণ কমানো
হয়েছে। ফলে নিম্ন গতিতে জলের পরিমাণ কম থাকায় সেখানে নদী গতিহারা হয়ে বয়ে আনা পলিকে
সঞ্চয় করে নদীবক্ষ উঁচু করছে। নদীতে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদের সংখ্যা বৃদ্ধি এর সবথেকে বড়
উদাহরণ।
নদীর পলি অপসারণের প্রধান
শক্তি তার জলের পরিমাণ ও ঢাল। সময়ের সাথে সাথে ভুতাত্ত্বিক যুগের ঢাল বর্তমানে পূর্বদিকে
মায়ান্মারের দিকে হওয়ায় নদীর গতিবেগ আর ঢাল দ্বারা খুব একটা প্রবাহিত হয় না। আবার উচ্চগতিতে
বাঁধ, জলাধার, জলের নিয়ন্ত্রন ইত্যাদি কারনে নিম্নের পলি সঞ্চয়। ফারক্কা ব্যারেজ করে
ফিডার ক্যানালের মাধ্যমে জল আনার পরিপ্রেক্ষিতে আজও জলের সংস্থান গঙ্গায় তথা ভাগীরথী
তথা হুগলী নদীতে গঙ্গার জল আসে নইলে বেশিরভাগটাই তার উপনদী ও নিম্ন বদ্বীপ এলাকায় জোয়ারি
জল গঙ্গার নদী মাহাত্ম্য বাঁচিয়ে রেখেছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন ‘যে নদী হারায়ে স্রোত
চলিতে না পারে, সহস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে’র মত অবস্থা এই গঙ্গার। আমাদের প্রজন্ম
যেমন বিশ্বাস করতে চায় না গড়িয়া রাজপুর বারুইপুর বারাসাত জয়নগর ভেদ করে বড় বড় বানিজ্য
জাহাজ নাকি সাগরে যেত ঠিক তেমনিভাবে হয়তো কলকাতা ডায়মন্ডহারবার হয়ে আজ যে বানিজ্যতরী
যায় পরের কয়েক হাজার পরে তা মানুষ ভাবতে পারবে না।
মানব
কল্যাণের কারনে যে গঙ্গার কৈলাস থেকে সাগরে আগমন সেই গঙ্গা আপাদ মস্তক অপমানিত হয়েছে
দূষণ আর অপহরণের কারনে। যার যখন ক্ষমতা এসেছে সেই তখন লুঠ করেছে গঙ্গাকে। তাই গঙ্গা
হয়তো ভাবছে এভাবে বাঁচার থেকে আত্মহত্যায় শ্রেয়! স্বার্থপর মানবজাতি ত্রিবেণীর সরস্বতী
বা উত্তর পশ্চিম ভারতের সরস্বতীকে কতটা সম্মান দিয়েছে? দেয় নি। বরং আদি গঙ্গার মাহাত্ম্যকে
অস্বীকার করে তার বক্ষ বিদীর্ণ করে ছুটিয়ে দেওয়া হয়েছে আধুনিক সভ্যতার মানুষের বিলাসপ্রিয়
মেট্রো রেল। সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করার আগে নদীর পাশে দাঁড়ানো দরকার আমাদের। তাঁকে
তাঁর মতো করে বাঁচতে দেওয়া উচিত। নদী তো মানব জীবনের মত। তাঁর মান অভিমান সব আছে। শুধু
তাঁর ভাষা বোঝার লোকের দেখা নেই। আরও অনেক প্রকৃতি
প্রেমিক দরকার যারা সময় পেলে নদীর কাছে যাবে, তাঁর
ভাষা বোঝার চেষ্টা করবে। তাই প্রকৃতির মাঝে
প্রকৃতির সন্তান হয়ে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে তার কোলে আশ্রয় নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে
সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে আমাদের এই প্রকৃতিকে বাঁচাতে হবে, মানুষকে অভিযোজন করতে
হবে প্রকৃতির ধারার সাথে। নিয়ন্ত্রনবাদকে সরিয়ে রাখলেও আমরা সম্পূর্ণভাবে
সম্ভাবনাবাদ নিয়ে এগিয়ে না গিয়ে নবনিয়ন্ত্রণবাদী ধারণা নিয়ে এই প্রকৃতির মাঝে
অবস্থান করতে পারি। তাতে এই পৃথিবী সুন্দর হয়ে উঠবে বলে মনে করি।
শেষকথা
জয়নগরকে সুন্দরভাবে জনসাধারনের জন্য তুলে ধরতে হলে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিতে হলে কর্তৃপক্ষকে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করি। এই জয়নগরের প্রথম সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করতে হবে। মূল সড়কপথ সংস্কার করার উদ্যোগ নিতে হবে। রাস্তা প্রশস্ত না হলে এই জয়নগর অনেকটাই উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে নিজ দোষে। ভারতীয় রেল দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের জয়নগর মজিলপুর স্টেশনকে মডেল ষ্টেশনের মর্যাদা দিয়ে সংস্কার করতে হবে। শুধুমাত্র এর ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে সরব হতে হবে দলমত নির্বিশেষে। স্টেশন চত্বরের সকল অবৈধ নির্মাণ বা দোকান তুলে দিয়ে বাস বা অটো টার্মিনালের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ মানুষ ট্রেন থেকে নেমে যদি বর্তমান ঘিঞ্জি অবস্থা দেখেন তাহলে তার মাথা থেকে সমস্ত অতীত বা ধর্মীয় ভাবাবেগ সরে যেতে পারে। মন্দির বা ঐতিহাসিক সৌধ ও তাঁদের পীঠস্থানগুলি সংস্কার বা সংরক্ষন করে মানুষের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। যেসকল পত্রপত্রিকা, প্রবন্ধ, ডকুমেন্টস বা তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য আমার এই প্রবন্ধ আপনাদের সামনে তুলে ধরতে সহায়তা প্রদান করেছে তাঁদের সকলের কাছে আমি বিনম্র চিত্তে কৃতজ্ঞ জানাই।
সূত্রঃ
- দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ইতিহাস – সুকুমার সিং
- রত্নগর্ভা সুন্দরবনের স্মরণীয় ও বরণীয়
ব্যক্তিত্ব – প্রবীর চক্রবর্তী
- প্রসঙ্গঃ সুন্দরবন (১ম ও ৩য় খণ্ড) – সনৎকুমার পুরকাইত ও
উমাশঙ্কর মণ্ডল (সঃ)
- দক্ষিণ ২৪ পরগণার স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, সংক্ষিপ্ত
জীবনী সংকলন – সঞ্জয় ঘোষ
- The Journey of Kalidas Datta and the
Construction of Regional History in Pre- and Post Independent Bengal,
India – Bishnupriya Basak
No comments:
Post a Comment